ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
ঢাকা

menu

জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো

 প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন

প্রকাশিত: আগস্ট ১, ২০২৬, ১২:৫২ এএম

জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো

মার্চ যেমন আমাদের রক্তে উন্মত্ততা সৃষ্টি করে, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখায়, তেমনি জুলাইও আমাদেরকে সাহসী করে তুলে, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জুগায়। একথা সত্যি যে, স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে সেরা ঘটনা। কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যে, স্বাধীনতার পর জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

জুলাই কারো কাছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা, কারো কাছে বিপ্লব, কারো কাছে গণঅভ্যুত্থান। তবে জুলাইকে যে যে নামেই অভিহিত করুক না কেন, এটি যে আমাদের জীবনকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছে তাতে কোন দ্বিমত নেই। যারা জুলাই ঘটিয়েছে, তাদের কাছে এটি এক মহান সংগ্রামের নাম। যারা জুলাইয়ের বিরোধীতা করেছে, তাদের কাছে এটি এক বেদনার ইতিহাস।

সময়ের পরিক্রমায় আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মতোই জুলাইও বিতর্কহীন হবে, সর্বজনগ্রাহ্য হবে বলেই মনে করি।

আমি ও আমার পুরো পরিবার (স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলে) জুলাইয়ে সক্রিয় ছিলাম। যার যার অবস্থান থেকে জুলাইয়ের পক্ষে কাজ করেছি। মধ্য জুলাই থেকে ছত্রিশ জুলাই পর্যন্ত উদ্বিগ্ন থেকেছি, নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি, ছেলে-মেয়েদের নিরাপদে বাসায় ফেরার অপেক্ষায় থেকেছি, ঘনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ রেখেছি, তাদের সাহস দিয়েছি। কিন্ত সবচেয়ে বেশি যে কাজটি করেছি তা কখনো কাউকে বলা হয়নি।

জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকেই কোটা বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধছিলো। গঠিত হয়েছিলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামের সংগঠন। বিপরীতে ন্যায়সঙ্গত একটি আন্দোলন দমাতে গিয়ে শাসকশ্রেণি বারবার ভুল করছিলো। আসলে পতন যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন ছোট ঘটনায় এমন বড় বড় ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ফ্যাসিস্ট সরকার পরোক্ষভাবে ঘোষণা দিয়েছিলো, তারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে। প্রধান বিরোধী দলসহ দেশের মানুষও যেন তা মেনে নিয়েছিলো, বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলো। কিন্তু আমার মতো অল্প কিছু মানুষ বিশ্বাস করতাম যে, স্বৈরাচারের পতন ঘটবেই। আজ, কাল, পরশু – পতন ঘটবেই। পৃথিবীর কোন স্বৈরশাসক অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেত পারেনি। পাপের ঘড়া পুর্ণ হওয়ার পর কোন না কোন ভাবে তাদের পতন অনিবর্য হয়েছে। তাই স্বৈরাচার শেখ হাসিনারও যে পতন ঘটবে, তাতে কোন সন্দেহ ছিলো না।

স্বৈরাচারের পতনের আন্দোলন চলছিলো দীর্ঘ সতের বছর ধরেই। এই আন্দোলনের মধ্যেই তিন তিনটি অবৈধ নির্বাচন হয়ে গেলো। এসব নির্বাচন রাতের ভোট, আমি-ডামি নির্বাচন হিসেবে খ্যাত। অবৈধভাবে সীমাহীন ক্ষমতা পেয়ে ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন, বিচারক, সেনাবাহিনী, সাংবাদিক, শিল্পী, খেলোয়াড়, শিক্ষক, ব্যবসায়ী – সবাইকে অনুগত করে নিতে সক্ষম হয়। শুধু একটি গোষ্ঠীকে কোনভাবেই আনুগত্য স্বীকার করাতে পারেনি। তারা হলো ছাত্র সমাজ।

এই ছাত্ররা অতীতেও ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। কখনো কোটা বিরোধী আন্দোলন, কখনো নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত ফি ধার্য্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তবে ২০২৪ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলন শেষতক সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।

কোটা নিয়ে সরকারের ছলচাতুরিতে অতীষ্ঠ হয়ে ওঠে ছাত্রসমাজ। কখনো প্রশাসনের দোহাই দিয়ে, কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের দোহাই দিয়ে, কখনো আদালতের দোহাই দিয়ে ছাত্রদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে শাসকশ্রেণি। কিন্তু জেন-জিরা যে শাসক শ্রেণির চেয়েও বুদ্ধিমান তা শাসকশ্রেণি বুঝতে পারেনি। ফলে তাদের সকল কূটকৌশল ভেস্তে যায়। বিশেষ করে জুলাই মাসের ১৪ তারিখে ছাত্রসমাজকে রাজাকার ট্যাগ দেয়ার পরই হাসিনা-শাহীর পতনের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। যে ট্যাগ দিয়ে দীর্ঘ সতেরো বছর বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিশেষত বিএনপি ও জামায়াতকে দমিয়ে রাখতে পেরেছিলো, সেই ট্যাগই ছাত্ররা আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বৈরাচারের মসনদ কাঁপিয়ে দেয়। ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছাত্রদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশের আপামর জনসাধারণ ও রাজনৈতিক দলগুলো। এমনকি আওয়ামী ঘরানার অনেক লোক এই আন্দোলনকে সমর্থন দেয়, কেউ কেউ দলত্যাগ করে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্দ ছিলো। গুম, খুন, হত্যা, আয়নাঘর, টর্চারশেল প্রভৃতির কারণে রাজনৈতিক সচেতন মহল ক্ষুব্দ ছিলো। কোটা, ছাত্রলীগের নির্যাতন, চাকুরি ক্ষেত্রে দলীয় নিয়োগ প্রভৃতি কারণে ছাত্ররা ক্ষুব্দ ছিলো। মধ্য জুলাইয়ে এসে সকলের ক্ষোভ এক বিন্দুতে মিলিত হলো। জুলাইয়ের ১৬ তারিখে রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ শহিদ হলে জনগণের সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়।

টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ায় স্লোগান ওঠে, বুকের মাঝে অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর। দুহাত প্রসারিত আবু সাঈদের ছবি বিশ্ব বিবেককে পর্যন্ত নাড়িয়ে দেয়।  

১৮ জুলাই শহিদ হন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে পানি বিতরণকালে পুলিশ তাকে হত্যা করে। তার ‘পানি লাগবে পানি’ কথাটি আন্দোলনকে বেগবান করে। বিশেষকরে পাবলিক বিশ্বদ্যিালয়গুলোর আবাসিক হলগুলো বন্ধ ঘোষণা করলে আন্দোলন স্থিমিত হওয়ার আশংকা দেখা দেয়। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দ্রুতই রাস্তায় নেমে সে শূন্যস্থান পুরণ করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেয়ায় তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ফ্যাসিস্ট সরকার ভয় পেয়ে যায়। জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে।  

ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। একইসাথে আন্দোলনও বাড়তে থাকে। দেশের মানুষ হয় বিজয়, না হয় শহিদ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। মূলত মধ্য জুলাই থেকেই স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে এবং রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া দলটি বুঝতেই পারে নাই যে, রক্ত-গঙ্গা বইয়ে আন্দোলন নস্যাৎ করা যায় না। প্রতিটি হত্যার পর আন্দোলনে আরো লক্ষ লক্ষ মানুষের সমর্থন বাড়তে থাকে, অংশগ্রহণও বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝেও।

সমাজের সকল স্তরের মানুষ আন্দোলনে শরিক হতে থাকে। শিক্ষার্থী ও রাজনীতিবিদ ছাড়াও শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, কামার, কুমার, রিকসাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, দোকানদার, গৃহিণী, ব্যবসায়ী, পথচারী, হকার, ভবঘুরে, বেকার, শিক্ষিত, অশিক্ষিত – সমাজের সকল স্তরের মানুষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে থাকে। যা দমানোর সাধ্য কারো ছিলো না।

জুলাইয়ের ১৯ তারিখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৯ দফা ঘোষণা করে। সম্ভবত এটিই ছিলো সরকারের সাথে আন্দোলনরতদের দফারফার শেষ সুযোগ। কিন্তু সরকার এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। ২০ জুলাইয়ে কারফিউ জারি করে আনোদলনকারীদের উপর তান্ডব চালাতে থাকে। বিপরীতে ২১ জুলাইয়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি দেয় শিক্ষার্থীরা। পরদিন সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে দেশকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

শুরু হয় অমানুষের বিরুদ্ধে মানুষের মরণপণ লড়াই।

জুলাইয়ের শেষদিকে আমার টেনশান বাড়িয়ে স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং কিছুটা স্বতংস্ফুর্তভাবেই তাদের মা-ও তাদের সাথে যোগ দেয়। আমার কাজ ছিলো ফোনে ওদের মায়ের কাছ থেকে ওদের খবর নেয়া। এর বাইরে ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা ও তাদের উদ্বুদ্ধ করা।

আরেকটি কাজ করেছি নিরবে, অতি সংগোপনে। আমি যেহেতু একজন ডিএক্সার সেহেতু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেডিও স্টেশনের ইমেইল ঠিকানা আমার জানা ছিলো। এসময় প্রতিদিন বিভিন্ন বেতার কেন্দ্রে বাংলাদেশের আন্দোলন নিয়ে এবং আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন দেয়ার জন্য ইমেইল করি। ডয়চে ভেলে, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও জাপান, সিআরআই, বিবিসি প্রভৃতি বেতার ও রেডিও স্টেশনে আমার ও স্ত্রীর ইমেইল থেকে ইমেইল করতাম। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে সেসব ইমেইল আবার সাথে সাথে ডিলিট করে দিতাম। আমার এ প্রচেষ্টা আন্দোলনে হয়তো কোন কাজে আসেনি, তবু নিজের সাধ্যমতো কিছু করতে পারছি ভেবে ভালো লাগতো।

ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই সৌভাগ্যবান। আমার পরিবারের তিনজন সদস্য মহান মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকেই অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অবদানের জন্য আমরা গর্বিত। অন্যদিকে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন শুরু হয় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। জিয়াউর রহমান হলের একজন আবাসিক ছাত্র হিসেবে স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি এবং ১৯৯০ সালে আমরা সফল হই। আর ২০২৪ সালে যখন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, তখন আমার স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে তাতে অংশগ্রহণ করে। ৩৬ জুলাইয়ে তাদের বিজয় দেখে, বিজয়ে তাদের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে হৃদয়টা আমার শান্তিতে ভরে গিয়েছিলো।  

যাই হোক, আসল কথায় ফিরে আসি। জুলাইয়ের ৩০ তারিখে ছাত্ররা প্রোফাইল লাল করার সিদ্ধান্ত নিলো। ভয়ে ভয়ে নিজেও প্রোফাইল লাল করলাম। তবে কর্মস্থলে গেলে বা বাইরে বের হলে সাথে মোবাই নিয়ে যেতাম না। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বাইরে মোবাইল নিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। শুধু একটি বাটন মোবাইল নিয়ে বের হতাম। আর ভোর রাত অবধি মোবাইল টিপতাম, নিউজ স্ক্রল করতাম। কোন পত্রিকা বা টেলিভিশনের উপর আমাদের আস্থা ছিলো না। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হই। এসময়ই বেশ কয়েকজন বিখ্যাত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা ইউটিউবারের কথা জানতে পারি, যারা ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে।  

শুধু আমি নই, মধ্য জুলাই থেকে দেশের প্রতিটি মানুষ নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। আত্মীয় বা পরিচিত অনেকের সাথে মাঝ রাতে ফোনে কথা বলেছি, ইঙ্গিতে তথ্য আদান প্রদান করেছি।                        

৩১ জুলাইয়ে যখন ছাত্ররা মার্চ ফর জাস্টিসে ডাক দেয়, তখন থেকেই মনে হচ্ছিলো এবার ফ্যাসিবাদের পতন হতে যাচ্ছে। ১ আগস্টে দেখলাম ছাত্ররা লিখছে ৩২ জুলাই। তার মানে তারা জুলাইকে টেনে লম্বা করতে চাচ্ছে যেন জুলাইয়ের স্পিরিট অব্যাহত থাকে এবং আন্দোলনটাকে জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায় শেষ করা যায়। ছাত্রদের এই সৃষ্টিশীলতায় দেশের মানুষ মুগ্ধ হয়েছিলো। যদিও প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে ছাত্রদের শব্দচয়ন, স্লোগান ও কর্মসূচিতে বিশেষ একটা নতুনত্ব ছিলো, যা দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করেছিলো।

অবশেষে ৩৪ জুলাইয়ে (৩ আগস্ট) ঐতিহাসিক ১ দফার ঘোষণা হলো। ডু অর ডাই অবস্থানে চলে গেলো ছাত্ররা। পুরো দেশবাসী ছাত্রদের পাশে দাঁড়ালো। জুলাইয়ের ৩৫ তারিখে (৪ আগস্ট) লং মার্চ টু ঢাকার আহ্বান এলো। প্রথমে ৬ আগস্টে এবং পরবর্তীতে সংশোধন করে ৫ আগস্টে ঢাকা অবরোধের ডাক দেয়া হলো। জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো এটি। কেননা একদিন দেরি হলে পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতো পারতো।

সারা রাত নির্ঘুম। শুধু মোবাইলে চোখ রাখা। অবাক হয়ে দেখলাম দেশের কোন জায়গা থেকে কিভাবে ঢাকায় আসতে হবে সেসব রোডম্যাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিভাবে আসতে হবে, কত খরচ হবে, কোথায় হাঁটতে হবে, কোন পথ দিয়ে ঢুকতে হবে সব ঠিক করে দেয়া। যেন কোন সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা।  

৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট)। টেনশান নিয়ে বাসায় বসে আছি। সকাল ৮টায় বিমান বন্দর এলাকায় বসবাসরত এক ছাত্রকে ফোন দিলাম। সে বললো রাস্তায় কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে, তারা হেঁটে শহরের কেন্দ্রস্থলে যাচ্ছে। একটু পর উত্তরায় বসবাসরত এক বন্ধুকে ফোন দিলাম। তার বাসা থেকে প্রধান সড়ক দেখা যায়। সে জানালো লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে। ঘন্টাখানেক ধরে শুধু মানুষ পঙ্গপালের মতো ঢাকায় ঢুকছে। ঢুকছে তো ঢুকছেই। বন্ধুর কথা শুনে একটু স্বস্থি লাগলো, একটু শান্তি লাগলো।

দুপুরের দিকে যখন সেনাপ্রধান গণমাধ্যমে কথা বলার ঘোষণা দিলেন, তখন স্বস্থি ও শান্তিতে মনটা ভরে গেলো। দু’চোখে রাজ্যের ঘুম। আহা কতদিন শান্তিতে ঘুমাইনি। এখন শান্তিতে একটু ঘুমুতে চাই।     
(লেখক- প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ। ইমেইল-sahadot.hossain@gmail.com)

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!