বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান সংকট মূলত দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতা ও ভুল নীতিনির্ধারণের ফল। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও বড় অঙ্ক—প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা—পাঁচটি ব্যাংকের জন্য সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল অর্থের বিপরীতে সরকার কোনো দৃশ্যমান রিটার্ন পাচ্ছে না।
এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হয়েছে, তা হলো জনগণের আস্থা। ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্তসহ বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ মুহূর্তের মধ্যে আমানতকারীদের আস্থাকে নষ্ট করেছে। এর সঙ্গে নতুন আইন—ব্যাংক রেজুলেশন সংক্রান্ত ধারা—আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সরকার বলছে, পুনর্গঠনের পর ব্যাংকগুলো আবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু এই নীতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদি সত্যিই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে শুরু থেকেই স্বচ্ছভাবে শক্তিশালী ও সুনামধন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংকগুলো ছেড়ে দেওয়ার সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত ছিল।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো এক ধরনের দিকনির্দেশনাহীন অবস্থায় আছে। সরকার কাদের হাতে ব্যাংকগুলো দিতে চায়, তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি যাদের প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তাদের সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। ফলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এই অবস্থায় করণীয় হলো দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়া যদি এগিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে তা বিলম্ব না করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব দিতে হবে এমন শিল্পগোষ্ঠীর কাছে—
* যাদের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী
* যাদের কর প্রদানের রেকর্ড ভালো
* যাদের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক অনিয়ম বা কেলেঙ্কারির অভিযোগ নেই
* যারা বাজারে “ক্লিন ইমেজ” হিসেবে পরিচিত
কারণ ব্যাংকের বোর্ডে কারা আছেন, সেটিই এখন আমানতকারীদের আস্থার মূল নির্ধারক। জনগণ বোর্ডের সদস্যদের পরিচয় ও সুনাম দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা ব্যাংকে টাকা রাখবে কি না।
এছাড়া, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ইতোমধ্যে এই খাতে বিনিয়োগ করেছে, তা দ্রুত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে নতুন উদ্যোক্তাদের। স্বল্প সময়ের মধ্যে এই অর্থের কার্যকর ব্যবহার ও পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে না পারলে ব্যাংকগুলো সামনে এগোতে পারবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ব্যাংকিং খাত মূলত জনগণের অর্থ দিয়ে পরিচালিত। তাই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর এই আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ক্লিন ইমেজসম্পন্ন উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংকের দায়িত্ব তুলে দেওয়া।

