ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
ঢাকা

menu

ভিন্ন ভিন্ন আঁঙ্গিকে আমার দেখা, প্রেসিডেন্ট জিয়া

মোঃ ফরহাদ উল্লাহ্

প্রকাশিত: জুন ১, ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম

ভিন্ন ভিন্ন আঁঙ্গিকে আমার দেখা, প্রেসিডেন্ট জিয়া

নিজস্ব

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে-১৯৭৮ সালের ১লা জানুয়ারী জাতীয়তাবাদী ফন্টের অস্থায়ী কার্যালয় ৩৩/১ নং পুরানা পল্টনের উদ্বোধনের দিনে মোনাজাতে শামিল হওয়ার সুবাদে আমার রাজনৈতিক জীবন ধারা প্রথম রূপ। সেদিন ঘি রং-এর বুশ-শাট, প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস পরিহিত মাথায় সাদা ক্যাপ প্রেসিডেন্ট আমাদের সবার সাথে ফন্টের অফিসের কার্পেট বিছানো ফ্লোরে বসে দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদের মাধ্যমে মোনাজাত শেষ করেছেন। তখন বর্ষিয়ান রাজনৈতিক নেতা মশিউর রহমান জাদু মিয়া, বিচারপতি আব্দুর ছাত্তার, মীর্জা গোলাম হাফিজ, বি চৌধুরী (একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী) , ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার, ক্যাপ্টেন অবঃ হালিম চৌধুরী, মাওলানা মতিন, কর্ণেল অবঃ আকবর হোসেন, ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদা, ডা. আব্দুল মতিন ও ফিরোজ নুন সহ ফন্টের শরীক দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করেন। এই বৈঠকেই তেশরা জুনের (৩ জুন ১৯৭৮ ) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অংশগ্রহণের জন্য কর্মপন্থা ঠিক করলেন। পল্টন এলাকার সাথে বায়তুল মোকারম জাতীয় মসজিদ থেকে যোহরের আজানের ধ্বনি শুনা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি জিয়া নামাজে শরীক হওয়ার জন্য সবার সাথে বিদায়ের পূর্বে হাত মেলালেন। সেদিন পল্টনের প্রতিটি রাস্তা,অলিগলি, বাসা-বাড়ির জানালা,  বারান্দা, অফিসগুলোর ছাদ থেকে জিয়াকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন অগণিত দলমত নির্বিশেষের সাধারণ মানুষ। সেদিন ছিল সে এক অন্য রকম দৃশ্যপট।

মশিউর রহমান যাদু সাহেবের ভাষানী ন্যাপ। বিচারপ্রতি আব্দুর ছাত্তার সাহেবের জাগো দল, ক্যাপ্টেন অবঃ হালিম চৌধুরী, কর্ণেল আকবর হোসেনর ইউ.পি.পি, লেবার পার্টির মওলানা আব্দুল মতিন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহ আজিজ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির এস.এম সোলাইমান সাহেবের নেতৃত্বে ৬ দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী ফন্ট, জাতীয়তাবাদী ফন্টের চেয়ারম্যান হিসাবে জিয়াউর রহমান সাহেব কে মনোনীত করা হয় এবং আগামী তেশরা জুনের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মুক্তিযুদ্ধের সর্বার্ধিনায়ক অবঃ জেনারেল ওসমানীকে মনোনয়ন প্রদান করেন। এরপর দেশব্যাপী ভিন্ন ভিন্ন দলের নির্বাচনী প্রচারনা, প্রচারভিজান, জনসভা, পথসভা স্বাধীন বাংলাদেশ আবার ফিরে পেতে যাচ্ছে হারানো ভোটের অধিকার, বহুদলীয়ও গণতন্ত্রের পদধ্বনী। নির্বাচনের আগেই কৃষক-শ্রমিকে ব্যাপক হারে কাজের উদ্যোগগ্রহণ করেন প্রেসিডেন্ট। কৃষকরা নতুন রূপে কৃষি উৎপাদনে মনোনিবেশ করে শ্রমিক শ্রেণীর বলিষ্ট সৈনিকরা কল-কারখানায় নিরলসভাবে রাত্রি-দিনে পরিশ্রম করে জিয়াউর রহমানের কৃষি বিপ্লবে বাস্তবায়নে প্রথমধাপ শুরু করেন।

জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সারাদেশে গ্রামেগঞ্জে, হাটে, বাজারে, পাড়া-মহল্লায় কৃষকের ঘরে ঘরে, শ্রমিকের দ্বারে দ্বারে ভোট চাইতে নেমে পড়েন। তারই অংশ হিসেবে ১৯৭৮ সালের ১৪ই মে এক সকালে পাবনা ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে জাতীয়তাবাদী ফন্টে নেতাদের নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পাবনায় আগমন করেন। সফর সঙ্গীদের তালিকায় মীর্জা গোলাম হাফিজ সাহেব, ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার, ক্যাপ্টেন অবঃ হালিম চৌধুরী, মওলানা মতিন, ফিরোজ নূন, হাজী মুনসুর আলী সরকার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে ওই সময়ে পাবনা জেলায় গঠিত জাতীয়তাবাদী ফন্টে নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তার সফর সঙ্গীদেরকে অভ্যর্থনা জানান। এড. খোরশেদ আলম, হাসনাত চেয়ারম্যান, জামাত আলী জুম্বু, বাবু বিরেশ মিত্র, হাবিবুর রহমান তোতা, ঈশ্বরদীর আব্দুল বারি সরদার, টুকু সরদার, সিরাজ সরদার, জর্জিস, মমতাজ আলী, মোশারফ হোসেন, পিয়ারা সাহেব, হাসিনা কোরেশিসহ সর্বস্থরের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নিবেদিত সৈনিকরা। নিবেদিত যুবসমাজ থেকে আগত ইসমাইল হোসেন খান, আব্দুল হাই বাদশা, মুন্নু, ইয়াকুব আলী স্বপন, কবু, মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, শাহান, খোকন, বাবলু, আতিয়ার। প্রেসিডেন্ট জিয়া বিমান থেকে নেমেই টার্মিনালের বাইরে অপেক্ষামান জেলার নেতাদের দিকে এগিয়ে আসলেন সবার সাথে হাত মিলিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। সড়ক পথে সভা যাত্রা আর পথসভা করতে করতে ঈশ্বরদী, দাশুড়ীয়া, মুলাডলী, রাজাপুর, বনপাড়া, নাটোরে দুপুরের খাবার খেয়ে ট্রেনযোগে নওগাঁর উদ্দেশ্যে শান্তাহার রেলস্টেশনে পথসভা শেষ করে সড়ক যোগে নওগাঁ কলেজ মাঠ প্রাঙ্গনে উপস্থিত হন। সেখানে বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখলেন।

পৌরসভা চেয়ারম্যান মোরশেদ আলীর  সভাপতিত্বে প্রেসিডেন্ট জিয়া, ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকারের সাথে নওগাঁকে জেলা ঘোষণার বিষয়ে আলাপ করলেন। এবং সেখানেই নওগাঁকে জেলা ঘোষণা করলেন। জনসভা শেষে আমরা সবাই বদলগাছী থানার উদ্দেশ্যে সড়ক পথে রওনা দিলাম। দীর্ঘ্য ২৭-২৮ কিঃমিঃ পথ অতিক্রম করে বিকেল ৫টায় বদলগাছী কলেজ মাঠে জনসভায় উপস্থিত হই। হাজার হাজার কৃষক জনতার মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়া জনসভায় নির্মিত মঞ্চে দুই হাত তুলে জনতার অভিনন্দনের জবাব দিয়ে আসন গ্রহণ করেন।

বদলগাছী জনসভায় জিয়াউর রহমান নওগাঁর বীর জনতার কাছে ভোট চাইলেন ও জনতার উদ্দেশ্যে বললেন- মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের দুইটি পা দিয়েছেন, দুইটা হাত দিয়েছেন, দুইটি চোখ দিয়েছেন আল্লাহর দেওয়া হাত-পা, চোখ দিয়ে চেষ্টা করলে আমরা সকল কাজে কামিয়াব হতে পারব। আমরা লেখাপাড়া করতে পারবো, কলকারখানায় উৎপাদন করতে পারবো, জমিতে কৃষি উৎপাদন করে দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ করবো, আমরা ১ ইঞ্চি খালি জায়গা ফেলে রাখবো না, সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ রোপন করব। আমরা সবুজে ঘেরা একটা আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণ করব। বদলগাছীর জনসভা সন্ধ্যা ৭টায় শেষ করে কর্মসূচি মোতাবেক পূর্বে নির্ধারিত নওগাঁ সদরে আগমন এবং রাত্রীযাপন করেন প্রেসিডেন্ট। রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত সরকারি ডাকবাংলা এবং সফর সঙ্গীদের জন্য অন্যান্য রেস্টহাউজ ও হোটেল ব্যবস্থা ছিল।

মীর্জা গোলাম হাফিজ, জমির উদ্দিন সরকার, অবঃ ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীসহ আমি নওগাঁ সড়ক ও জনপথ রেষ্ট হাউজে অবস্থান করি। সারাদিন জনসভা পথসভা প্রচন্ড গরম আর বৈশাখ মাসের রৌদে সবাই ক্লান্ত আমরা গোসল সেরে প্রস্তুতি নিতে নিতে রাত্রী ৯টা বেজে গেল। রাতে রাষ্ট্রপতির সাথে খাবারের কর্মসূচি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। ইতোমধ্যে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল বারি সাহেব এসে সবাইকে  জানান দিলেন রাত্রি ১০ টায় রাতের ডিনার। রাষ্ট্রপতির সাথে নওগাঁর সরকারি ডাকবাংলোতে সফরসঙ্গী জাতীয় নেতারা যথা সময়ে ডিনারে হাজির হলেন এবং খাবার টেবিলে আসন গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট রাত ১০টা বাজার ৫মিনিট আগেই খাবার টেবিলে আসন গ্রহণ করলেন। এরপর প্রেসিডেন্ট জিজ্ঞাস করলেন সবাই এসেছেন। লেবার পার্টির মওলানা মতিন সাহেবকে প্রেসিডেন্ট হেঁসে বললেন “ক্ষুদা লাগছে মওলানা সাহেব” সেই দুপুরে নাটোরে শেষ খাওয়া হয়েছিল সারাদিন দীর্ঘপথ অতিক্রম করে পথে প্রান্তরে জনতার সাথে মিলনের কারণে ক্ষুদা ও ক্লান্তি লেগেছে বুঝতে পারি নাই, কথাটি রাষ্ট্রপতি নিজেই ব্যক্ত করলেন। খাবার টেবিলে বড় বড় পাত্রে সাজানো নওগাঁর বাসমতি চালের সাদা ভাত কৈ মাছ, মাগুর মাছ, পাবদা মাছ, খাসির মাংস, গুরুর মাংস, মুরগীর রোস্ট, মিস্টি আর দই টেবিলে সাজানো। তবে ডাউলের কোন আইটেম ছিলনা আমাদের সবাইকে খাবার আরম্ভ করতে বললেন রাষ্ট্রপতি। যথারীতি সবাই খাবার আরম্ভ করল। খাওয়া আরম্ভের ২-৩ মিনিট পর রাষ্ট্রপতি এ.ডি.সি ক্যাপ্টেন মাসুদকে বললেন ডাউল, কই! এই কথা শুনে প্রশাসনের লোকজন ভিশন ব্যস্ত হয়ে গেলেন। মনে হলো ডাউলের আইটেম ছিল না। যা হোক ডাউল নিয়ে রাষ্ট্রপতির আরেক এ.ডি.সি ফ্লাইট লেফটেনেন্ট রাজি ডাউলের পাত্র রাষ্ট্রপতির সামনে দিলেন। রাষ্ট্রপতি তার খাওয়ার প্লেটে একটি কৈ মাছ নিলেন, এক পিছ মাংস নিলেন, ডাউল পরিমাণে একটু বেশি নিয়ে খাওয়া শেষ করলেন। দই আলাদা ভাবে খেলেন। রাতের খাওয়া শেষে রাত ১১টায় আমরা যার যার অবস্থানে ঘুমাতে রওনা দিলাম। পরের দিন অর্থাৎ ১৬ই মে ১৯৭৮ সাল সকাল ১১টায় নাটোরের গোপালপুর চিনি কল স্কুল মাঠে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জনসভা আগে থেকেই নির্ধারণ করাছিল আব্দুল মান্নান ও ফজলুর রহমান পটল জনসভার মঞ্চে সভা পরিচালনা করলেন। পরবর্তী জনসভা পাবনার আটঘরিয়া, তারপর চাটমোহরের বালুর মাঠে। পথে পথে জনতার ঢল দুপুর সাড়ে ১২টা আটঘরিয়া স্কুল মাঠে জিয়া ঘোষণা দিলেন আটঘরিয়াতে কৃষি কলেজ স্থাপনের, চিকনায় নদীর উপর মূলগ্রাম ব্রিজ নির্মাণের ঘোষণা দিলেন। সমবন্টনের ভিত্তিতে সারাদেশের উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হবে।

আটঘরিয়ার জনসভা শেষে বেলা ১টায় চাটমোহর বালুর মাঠের জনসভায় জিয়া হাজার হাজার জনতার উদ্দেশ্যে আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বক্তব্য দিলেন। দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে আমাদের কৃষি উৎপাদন দ্বিগুন করতে হবে। যেখানে জলাশয় আছে সেসব স্থানে মাছের চাষ করতে, রাস্তার ধারে খালি জায়গায় বিভিন্ন ফলের গাছ লাগাতে হবে। বিভিন্ন জাতের ছাগল গাভী পালন করে সুসম খ্যাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষক ভাইয়েরা যাতে ন্যায্য মূল্যে সার, কৃষি উপকরণ, পায় তার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিরেন। এসময় স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে গ্রাম পুলিশ, দফাদার ভাইদের আধুনিকায়নের কথা বলেন জিয়া। গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে গ্রাম আদালত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথাও বলেন প্রেসিডেন্ট। জিয়া তার বক্তব্যে আরও বলেন, প্রচন্ড খড়া রৌদ্র অপেক্ষা  করে আজকে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আপনারা আমাকে আরও সাহস যুগিয়েছেন। আমি যেন আপনাদের মূল্যবান সময়ের উপস্থিতির মূল্যায়ন করতে পারি দোয়া করবেন এবং আগামী ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিবেন।

চাটমোহরের জনসভা শেষ হলো ১টা ২৫ মিনিটে, পরবর্তী জনসভা পাবনা পুলিশ মাঠে বেলা-২টা ২০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি জিয়া ঐতিহাসিক পাবনা পুলিশ প্যারেড মাঠে স্থাপিত মঞ্চে আগমন বিশাল মাঠের দক্ষিণে জি.সি.আই স্কুল মাঠে, পশ্চিমে মাটির সড়কের অবস্থান পূর্বে পাবনা জজ কোর্ট বিল্ডিং কোথাই যেন একটু খালি জায়গা নাই হাজার হাজার নারী-পুরুষ, কৃষক শ্রমিকের পদভারে যেন নতুন অলংকার পরেছে, এড. খোরশেদ আলী সভাপত্বিতে জনসভায় পাবনার জাতীয়তাবাদী ফন্টের নেতারা ভাষন দিলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জিয়াউর রহমানের পক্ষে সবাই ভোট চাইলেন।

প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতি জিয়া, পাবনার মানুষের কাছে অবহেলিত, পাবনার উন্নয়নের জন্য তাঁত শিল্পের জন্য সহজ শর্তে লোন প্রদান, গাভী, হাঁস-মুরগীর প্রান্তিক খামার করার জন্য স্বল্পমূ্ল্যে কৃষিলোন প্রদান, মরা জলাশয়গুলো সংস্কার করে মাছের চাষ বৃদ্ধি করা, গ্রামীণ অবকাঠামোর আওতায় রাস্তামাঠ, হাট, বাজারের সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি দেন। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ এবং অন্যান্য রাস্তার পাশের খালি জায়গায় বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ রোপন করবেন। দেশে ন্যায় সমতার ভিক্তিতে পাবনার উন্নয়ন করা হবে। ঘড়ির কাঁটা যখন ৩টা ২০ মিনিট কাছে তখন পাবনার জনসভা সমাপ্তি হলো।

রাষ্ট্রপতি মধ্যাহ্নভোজের জন্য পাবনা সার্কিট হাউজে গেলেন। সফর সঙ্গীদের সাথে মধ্যভোজের আধাঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে সড়কপথে পাবনার কাঁশিনাথপুর, বেড়া, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ হয়ে ১৬ই মে ১৯৭৮ সানে বগুড়া জেলার বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিবেন।
আমার জন্মস্থান পাবনা হওয়ার কারণে আমি তখন নির্বাচনের কিছু দায়িত্ব পালনের জন্য পাবনাতেই অবস্থান করলাম।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পূর্ণ হয়। জিয়া প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ভোটের ব্যবধানে নিকটতম আওয়ামী লীগের প্রার্থী জেনারেল (অবঃ) এমএজি ওসমানী কে হারিয়ে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী শক্তির  প্লাটফরম জাতীয়তাবাদী ফন্টের পদপ্রার্থী জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। যে নির্বাচনের মাধ্যমে একটা সুষ্ঠুনির্বাচনের ধারা সূচনা হলো জাতির জন্য একটা রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরীর পথসুগম  হলো। বিশ্বের দরবারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার সনদ লাভ করলেন। অতীতের সব রাজনৈতিক কলঙ্কের কালি মুছে ফেলার সময় অপেক্ষা করছে। জাতির সামনে আরও বড় ধরনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব অর্পন করা হলো, সেই দায়িত্ব দায় সদ্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাঁধে বহন করতে হলো। সেই আলোকে জিয়াউর রহমান জাতির দেওয়া ম্যান্ডেট নিয়ে আগামীতে বহু দলীয় গণতন্ত্রের রাস্তা নির্মাণের পথে পা রাখলেন। সেজন্য দেশে এবার সুন্দর অংশগ্রহণ মূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজনের পথে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯৭৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেন। ছোট বড় প্রায় ১১/১২ রাজনৈতিক দল, বিপুল উদ্বীপনা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে ৩৯ জনের সংসদ সদস্য নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে প্রধান দলের আসন অলঙ্কিত করলেন। বাংলাদেশ মুসলিমলীগ তৃতীয় অবস্থান অর্জন করেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে গঠিত জাতীয়তাবাদী ফন্টের বিলুপ্ত করে ফন্টের অন্যান্য শরীকদের নিয়ে মুক্তিকামী বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, লেখক, বৈজ্ঞানিক, স্থপতিসহ সব স্থরের মানুষের মিলন মেলায় রুপান্তর করে একটি দলের জন্ম হলো শহীদ জিয়া নাম দিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ হলো, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে একটা মন্ত্রিসভা গঠিত হলো, জিয়ার মন্ত্রিসভায় ছিল গোলাপের সমাহর, পান্না, চুন্নি, হিরা, মুক্তার আলো ছড়ানো। তেমনি বিরোধী দলের উপনেতা আওয়ামী লীগের আসাদুজ্জামান মুসলিম লীগের সবুর খান মত বর্ষিয়ান রাজনৈতিক নেতারা জিয়ার নির্মিত প্রথম সংসদকে অলংকিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার উল্লেখযোগ্য প্রধান বিচারপতি আঃ ছাত্তার, সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়া, জাতীয় সংসদের স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজ, বিএনপির প্রথম মহাসচিব ডাক্তার অধ্যাপক একিউএম বদরুদৌজা চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, পানি সম্পদ মন্ত্রী বি এম আব্বাস। এটি কৃষিতে মেজর জেনারেল অবঃ নূরুল ইসলাম শিশু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক সামসুল হক, পূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রী ব্যারেষ্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং অতিরিক্ত দায়িত্বপালন করতেন পরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, যুব মন্ত্রণালয় কর্ণেল ওলী আহমেদ, আবুল কাশেম, জ্বালানি মন্ত্রণালয় কর্ণেল আকবার হোসেন, মেজর জেনারেল মাজিদুল ইসলাম, ত্রাণমন্ত্রী এমরান আলী সরকার, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী, শিক্ষা অধ্যাপক ইউসুফ আলী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার মতিন, উপমন্ত্রী কামরুন নাহার জাফর, স্বরাষ্ট্র কর্ণেল মুস্তাফিজুর রহমান, ব্যারিষ্টার আনিছুল হক মাহমুদ প্রমুখ।

সারা দুনিয়ার কাছে জিয়ার নির্মিত বিএনপি সরকার বহুদলীয়  গণতন্ত্রের রোল মডেল রূপ লাভ করলো। জিয়ার খাল কাটা কর্মসূচির কারণে কৃষি উৎপাদনে এক নবযুগের সূচনা হলো। গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠায় জিয়া হেয়ে গেলেন গ্রাম বান্ধব জননেতা।

৬৮ হাজার গ্রামে ১ জন গ্রাম সরকার প্রধান ১ জন গ্রাম সরকার সচিব ও সদস্য সংখ্যা যদি ৫ জন ধরে হিসাব করা যায় তা হলে যোগফল মোট প্রতিগ্রাম = ৭ জন মোট গ্রাম = ৬৮ হাজার মোট= ৪ লাখ ৬৯ হাজার গ্রামের প্রতিনিধি স্থানীয় সরকারের কাজের সুযোগ পেয়েছিল। গ্রাম পুলিশদের আধুনিক করার প্রয়াসে জিয়া সচেষ্ঠ ছিলেন। সরকারের যুব মন্ত্রণালয়, পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালিদের বসতি স্থাপন করে আইন শৃঙ্খলার উন্নয়ন করা হয়েছিল, শিক্ষায়, সরকারি, চাকরিতে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হইত। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের কাছে জিয়া এক উচ্চতার আসীন হলে তার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টায় নির্মিত হলো ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)।

জিয়ার অবদান, তার জীবন ধারা, তার সততা, দেশ প্রেমিক, মহান স্বাধীন সংগ্রামে ২৬ শে মার্চে কালুর ঘাটে বেতারে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে শেখ মুজিবের পক্ষে ঘোষণা পাঠ করে জাতিকে সাহস যুগিয়ে স্বাধীন দেশ নির্মাণে তার অবদান অনন্য।

চট্টলার মানুষ ও চট্টলার মাটি এই দুইটা জিনিস জিয়া সব সময় একান্ত আপন ভাবতেন, সেই কারণে চট্টগ্রামকে সেকেন্ড হোম বলতেন। চট্টলার মানুষ জিয়ার দল বিএনপিকে ১৯৭৯ সনের সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে সংসদীয় আসনে জয়লাভ করেছিলেন। কেন যেন মহান জিয়া চট্টগ্রামের মাটিতে শাহাদৎ বরণ করলেন ৩০ শে মে মহান নেতা শহীদ জিয়া আপনাকে হারিয়ে একটি স্বাধীন দেশের মানুষ পরাধীনতার নিমজ্জিত। আপনার নির্মিত রাজনৈতিক দল বিএনপি আজ সারাদেশে, সারা বিশ্বে অভিনন্দিত। আরাফাতের মরুপ্রান্তেরে রাস্তার ধারে নিম গাছের শীতল ছায়ায় কতনা মুসাফিরেরা ক্লান্তি নিবারণ করেন, পবিত্র মক্কার প্রান্তরে আপনার স্মৃতি দৃশ্যমান। বিশ্বের মানুষ দেখে আপনার হাতের ছোয়ায় মরুপ্রান্তেও আল্লাহ রহমতে উজ্জীবিত হয় সবুজ শ্যামেল গাছ।

লেখকঃ অন্যতম রুপকার, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল।
        ও 
(১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্বাচন ও ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচার টিমের সদস্য)

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!