ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
ঢাকা

menu

দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্তের নির্দেশ

কমার্স ব্যাংকে ১০০ কোটি আমানতের জন্য ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ০২:১১ পিএম

কমার্স ব্যাংকে ১০০ কোটি আমানতের জন্য ৪ কোটি টাকা ‘আপ্যায়ন’

ফাইল ফটো

গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে ১০০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহের বিনিময়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চার কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে, আমানত সংগ্রহের নামে ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তার হিসাবে প্রণোদনা হিসেবে ওই অর্থ জমা দেওয়া হয়। পরে চেকের মাধ্যমে পুরো অর্থ তুলে নেওয়া হয়।

ঘটনাটিকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে দুজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে আগামী রোববার বিশেষ পর্ষদ সভা ডেকেছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এ বিষয়ে পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী মো. দেলোয়ার হোসেনকে বরখাস্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ কর্মসূচি ‘উজ্জীবন’-এর আওতায় কর্মকর্তাদের ‘প্রণোদনা’ দেওয়ার কথা দেখিয়ে চার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। তবে এ অর্থ দেওয়ার আগে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

পরিদর্শনে আরও দেখা যায়, গত ৪ জুন নয়টি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি চার লাখ টাকা এবং ৭ জুন পাঁচটি চেকের মাধ্যমে আরও ৯৬ লাখ টাকা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে উত্তোলন করা হয়। অর্থাৎ দুই দফায় মোট চার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী মো. হামিদুর রহমান এবং ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন ওই অর্থ উত্তোলন করেন। পরে বস্তায় ভরে কালো রঙের একটি গাড়িতে করে অর্থ নেওয়া হয় উত্তরা ক্লাব ও গুলশান ক্লাবে। গাড়িটির নম্বর ছিল ঢাকা-মেট্রো-১১-২০১০।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমানত সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত দেখিয়ে ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তার হিসাবে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ জমা করা হয়েছিল। এর আগে তাঁদের কাছ থেকে আগাম চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে ব্যাংকের এমডির পিএস হামিদুর রহমানের হিসাবে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা জমা ও পরে উত্তোলন করা হয়।

ঘটনার বিষয়ে ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্যও নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাঁর দাবি, এমডির নির্দেশেই তিনি টাকা দুটি ক্লাবে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে এমডির পিএস কাকে বা কী উদ্দেশ্যে ওই অর্থ দিয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই। চার কোটি টাকা উত্তোলন ও বহনের ঘটনায় তিনি কোনো অর্থ বা সুবিধা নেননি বলেও দাবি করেন।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেলোয়ার হোসেনের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে এনআরবিসি ব্যাংকে কর্মরত থাকার সময়ও তিনি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত ছিলেন।

চার কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ নিয়ে গত জুলাইয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর আগে ব্যাংকের এমডি ওবায়দুল হক নিজেই অভ্যন্তরীণ একটি প্রতিবেদনে গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে আমানত সংগ্রহের বিপরীতে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন বলে জানা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক পরে ঘটনাটি নিয়ে পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে যখন আমানতটি নেওয়া হয়, তখন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন মুহাম্মদ সোহেল হাসান। বর্তমানে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চার কোটি টাকা ব্যয়ের সঙ্গে ঘুষ বা অবৈধ সুবিধা গ্রহণের কোনো সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

ব্যাংকিং খাতে আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে গ্রাহককে অবৈধ সুবিধা দেওয়া কিংবা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া বিপুল অর্থ বিতরণের অভিযোগকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে কমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবার দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!