ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
ঢাকা

menu

ব্যাংককের গেইট থেকে ফেরত গেলেন কমার্স ব্যাংক চেয়ারম্যান

মোঃ দিদার হোসেন (সজীব)

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

ব্যাংককের গেইট থেকে ফেরত গেলেন কমার্স ব্যাংক চেয়ারম্যান

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানকে পদত্যাগের মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা দেওয়ার পর কমার্স ব্যাংকের দিলকুশার প্রধান কার্যালয়ের সামনে গেলেও ভেতরে প্রবেশ না করে বাসায় ফিরে গেছেন তিনি। ব্যাংকের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার বিষয়টি জানার পর আতাউর রহমান প্রধান কার্যালয়ের নিচে যান। তবে পরে তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ না করে বাসায় ফিরে যান। এ সময় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেককে চেয়ারম্যান পদত্যাগ করায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, আমাদের বুকের ওপর থেকে একটা পাথর সরে গেছে।  তার স্বেচ্ছাচারিতায় ব্যাংকের প্রতিটি কর্মকর্তা বিরক্ত। সে বিদায় হওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। 

জানা গেছে, সম্প্রতি কমার্স ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের জন্য ৪ কোটি টাকা আপ্যায়ন খরচ দেয়ার বিষয়টি আলোচনায় এলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। তবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান বিষয়টিতে মৌখিক সমর্থন দিয়েছেন।

একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে চেয়ারম্যানের প্রভাব এবং তার পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানা রিমাকে ঘিরে ব্যাংকের পদোন্নতি, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পদোন্নতি, বদলি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষের বাইরে থেকেও প্রভাব খাটানোর একটি অনানুষ্ঠানিক বলয় তৈরি হয়েছে। রাজধানীর দিলকুশা শাখাকে কেন্দ্র করে এসব বিষয়ে আলোচনা ও তদবির পরিচালিত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানা রিমা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ব্যাংকের সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে তার সক্রিয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পদোন্নতি ও বদলির বিষয়ে আগ্রহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের একটি প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।

গত কয়েক মাসে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এসব বদলির ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালার বাইরে প্রভাব কাজ করেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। নতুন নিয়োগ ও পদায়ন নিয়েও ব্যাংকের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, চেয়ারম্যানের অপছন্দের কর্মকর্তাদের বদলি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ব্যাংকের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে মো. আতাউর রহমানকে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সরাসরি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।

পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব বেড়েছে। কিছু পরিচালকও বিভিন্ন কারণে তার অবস্থানের বিপক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারছেন না। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ অবগত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এর আগে ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন দায়িত্ব ছাড়ার সময় গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ব্যাংকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ ছিল না। পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে উঠেছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

চেয়ারম্যানের সুযোগ-সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন:  ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, চেয়ারম্যানের জন্য নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধার বাইরে কিছু বিশেষ সুবিধা ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরও চেয়ারম্যানের নিয়মিত অফিস কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক চেয়ারম্যান আতাউর রহমানকে মৌখিকভাবে পদত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেননি বলে কমার্স ব্যাংকের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

চেয়ারম্যানের পুত্রবধূর বক্তব্য: অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে তানজিনা সুলতানা রিমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের কাছে তার মোবাইল নম্বরের উৎস সম্পর্কে জানতে চান। পরে কোনো মন্তব্য না করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। 

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!