লকারের চাবি ছিল গ্রাহকের কাছেই। অথচ সেই লকার খুলে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার বিরুদ্ধে। কানাডা প্রবাসী ফারজানা রহমানের দাবি, তার স্বাক্ষর জাল করে একটি ভুয়া ঘোষণাপত্র তৈরি ও ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর তারও প্রয়াত মায়ের নামে থাকা লকার থেকে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার সরিয়ে নিয়েছে।
শুধু লকার নয়, বিদেশে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে রেখে যাওয়া তার স্বাক্ষর করা চেকের পাতাও ব্যবহার করে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন ফারজানা রহমান লিমা। ঘটনায় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগ তুলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে করা মামলার নথি অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখায় ফারজানা রহমান লিমা ও তার মায়ের নামে ৪০৯ নম্বর লকার ছিল। ফারজানার দাবি, ওই লকারে তার নিজের স্বর্ণালংকারের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অন্যদিকে তার মায়ের গচ্ছিত স্বর্ণালংকারের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে লকারে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার ছিল বলে মামলায় দাবি করেছেন তিনি।
ফারজানার অভিযোগ, ২০১৯ সালের ১৫ জুন স্বামীর সঙ্গে কানাডায় যাওয়ার আগে নিজের স্বর্ণালংকার মায়ের লকারে রেখে যান তিনি। পরে মায়ের কাছ থেকে জানতে পারেন, লকারে তার নামও যুক্ত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তার মা মারা যান। এরপরও বিদেশে অবস্থানের কারণে ফারজানা দেশে ফিরতে পারেননি। তার অভিযোগ, এই সুযোগেই লকারটি নিয়ে শুরু হয় অনিয়ম।
মামলার অভিযোগে ফারজানা রহমান দাবি করেন, তার স্বাক্ষর জাল করে একটি ভুয়া ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়। তার বোন ফারহানা রহমান ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ওই ঘোষণাপত্র ব্যাংকে জমা দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফারজানার প্রশ্ন, তার অনুপস্থিতিতে এবং তার স্বাক্ষর যাচাই না করে কীভাবে ব্যাংক ওই নথি গ্রহণ করল? আর ওই নথির ভিত্তিতেই বা কীভাবে লকার পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলো? তার দাবি, পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের পার্সোনাল ডিভিশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) তাদের দুঃসম্পর্কের চাচা সাইফুল আমিরের যোগসাজসে ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লকারে থাকা স্বর্ণালংকার সরিয়ে নেওয়া হয়।
চলতি বছরের ১২ আগস্ট দেশে ফেরার পর লকারের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন বলে মামলায় উল্লেখ করেছেন। এরপর ২৪ আগস্ট ব্যাংকে গিয়ে লিখিতভাবে জানতে চান, তার অনুমতি ছাড়া কীভাবে তার নামে থাকা লকার থেকে স্বর্ণালংকার বের করা হলো।
ফারজানার দাবি, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাননি।
এদিকে সাইফুল আমিরের দাবি—ঘটনাটি সমাধান হয়েছে। সাদা কাগজে ফারজানা রহমান লিজা স্বাক্ষর করেছেন। ওই কাগজে তার বোন ফারহানা ও তার একজন ভাই সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তবে সমাধানের নামে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ফারজানা অভিযোগ করেছেন।
তার দাবি, ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। সেখানে কীভাবে এবং কোন নথির ভিত্তিতে গহনা হস্তান্তর করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাও তিনি দাবি করছেন।
অন্যদিকে তার বোন ফারহানা রহমান সুমি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ফারজানার স্বাক্ষর করা একটি নথির মুদ্রিত কপি তার কাছে রয়েছে। তবে মূল নথিটি কীভাবে তার হাতে এসেছে, সে বিষয়ে তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
ফারহানার ভাষ্য, তার বোনের স্বর্ণালংকারের একটি বাক্স তার কাছে রয়েছে। তবে গহনাগুলো অন্য একটি ব্যাংকের লকারে রাখা আছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন যেহেতু আমাদের পরিবারিক যৌথ সম্পদ এখনো ভাগ হয়নি তাই গহনাগুলোও ফারজানা রহমানকে দেয়া হয়নি। অন্যান্য সম্পদের সঙ্গে এগুলো দেয়া হবে। এখন গহনাগুলো কার তত্ত্বাবধানে আছে জানতে চাইলে ফারহানা এড়িয়ে যান।
এ ঘটনার বিষয়ে সাইফুল আমির বলেন, তিনি একটি পারিবারিক সালিশে উপস্থিত ছিলেন এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নির্দেশে সেখানে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আত্মীয়তার সূত্রে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে ফারহানা রহমানের বক্তব্য, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ী তার প্রতিনিধি এবং তাদের দূরসম্পর্কের চাচা সাইফুল আমিরের উপস্থিতিতে তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
ফারজানা রহমানের অভিযোগ, তার বোনকে সহায়তা করতে সাইফুল আমির ঘুষের মাধ্যমে ভূমিকা রেখেছেন। তবে সাইফুল আমির ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করেননি।
ঘটনার আইনি দিকেও প্রশ্ন উঠেছে। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ব্যাংক আমানত বা অন্যান্য নির্দিষ্ট সম্পদের বৈধ উত্তরাধিকার নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত মৃত ব্যক্তির সম্পদ বা পাওনা অর্থের ওপর বৈধ উত্তরাধিকার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, সম্পদের প্রমাণপত্র এবং আবেদনকারীর পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় নথি আদালতে উপস্থাপন করতে হয়। আদালত সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের নোটিশ দিয়ে আপত্তি বা দাবি জানানোর সুযোগ দেয়। এরপর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সনদ দেওয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে মানাহয়নি কোনো নীতিমালা।
অগ্রণী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি ব্যাংকের নজরে এসেছে। তবে লকারের চাবি সাধারণত গ্রাহকের কাছেই থাকে এবং চাবি দিয়ে লকার খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ফলে কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর সেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে সত্য বা মিথ্যা বলা যায় না। অভিযোগের নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে হবে। তদন্তে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অগ্রণী ব্যাংকের রমনা শাখার ডিজিএম গোলাম সরোয়ার বলেন, লকারের বিষয়ে কীভাবে কী হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তিনি ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই ওই শাখায় যোগ দিয়েছেন। ফলে আগের সময়ের ঘটনার বিষয়ে তৎকালীন কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি পারসুমা আলমকে কল করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। পরে তা পক্ষে ব্যাংকটির মুখপাত্র খন্দকার লুৎফুল কবির বলেন, তিনি এমডির পক্ষে বলতে চান বিষয়টি সমাধান হয়েছে। কিন্তু সাদা কাগজের স্বাক্ষরের ভিত্তিতে কিভাবে সমাধান হলো জানতে চাইলে লুৎফুল কবির বলেন, যেহেতু কর্পোরেট শাখার সংশ্লিষ্ট বিষয়টি তাই এনিয়ে আমার কিছু বলার নেই।
লকারের বাইরে ফারজানার স্বাক্ষর করা চেক ব্যবহার করে টাকা উত্তোলনের অভিযোগও মামলায় করা হয়েছে।
ফারজানার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিদেশে যাওয়ার সময় মায়ের দৈনন্দিন খরচ ও চিকিৎসার প্রয়োজনে স্বাক্ষর করা চেক বই মায়ের কাছে রেখে যান তিনি। পরে ওই চেক বইয়ের দুটি পাতা ব্যবহার করে অগ্রণী ব্যাংকের দুটি শাখা থেকে তার বোনের প্রতিনিধি ফাহমিদ ও সামিয়া যথাক্রমে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা ও ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। এ বিষয়ে গত ১৯ আগস্ট তার বোনের কাছে জানতে চাইলে তাকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেছেন ফারজানা।
পরে স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করেন তিনি। মামলাটির নম্বর ১৩৩৯/২৬। আগামী ৬ অক্টোবরের মধ্যে এ বিষয়ে হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে লিখিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা যাচাই করে দেখে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টতার ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গ্রাহকসেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ এলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল সরেজমিনে শাখা পরিদর্শন করে বিষয়টি তদন্ত করতে পারে।
ছবি সংগৃহীত

