দুই কর্মকর্তার নামে ২৮ কার্ড, অভিযোগের কেন্দ্রে পরিচালক রনজিত কুমার রায়
ব্যাংক পরিদর্শনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-৯-এর (বিএসডি-৯) দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকের ২৮টি ক্রেডিট কার্ড থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এর মধ্যে একজনের নামে ১৫টি এবং অন্যজনের নামে ১৩টি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিএসডি-৯-এর পরিচালক রনজিত কুমার রায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে রনজিত কুমার রায়কে বর্তমানে ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-৯-এর পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিএসডি-৯-এর কর্মকর্তারা বিভিন্ন ব্যাংক পরিদর্শনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কার্ড পাওয়ার পর এর বড় অংশের সীমা ব্যবহার করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ সমন্বয়ের জন্য ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ ক্ষেত্রে পরিচালক রনজিত কুমার রায়ের প্রভাব কাজে লাগানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিএসডি-৯-এর যুগ্ম পরিচালক নাজনু হাসানের নামে বিভিন্ন ব্যাংকের ১৫টি এবং যুগ্ম পরিচালক সুজন নাথের নামে ১৩টি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এসব কার্ডের সীমা ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করা হয়েছে।
কমার্স ব্যাংকে দুই কার্ডের আবেদন
সম্প্রতি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে বিএসডি-৯-এর একটি পরিদর্শন দল যাওয়ার পর নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় রনজিত কুমার রায়ের সুপারিশে দুই কর্মকর্তার নামে ৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকার ক্রেডিট কার্ডের আবেদন করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্রেডিট কার্ডের আবেদন গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চায়। এ নিয়ে বিএসডি-৯-এর সঙ্গে ব্যাংকটির টানাপোড়েন তৈরি হয় বলে দাবি সূত্রটির। এমনকি ব্যাংকের বিভিন্ন কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঋণ ও আয় নিয়েও প্রশ্ন
সিআইবি-সংক্রান্ত তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নাজনু হাসানের নামে ২০ লাখ টাকার একটি মেয়াদি ঋণ রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ি ও মোটরসাইকেলের ঋণের কিস্তি বাবদ তার মাসিক বেতনের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়। এ অবস্থায় তার নামে ১৫টি ক্রেডিট কার্ড থাকা এবং এসব কার্ডের ঋণ ও সুদ কীভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে শুধু একাধিক ক্রেডিট কার্ড থাকা বা ঋণ গ্রহণ করাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। ব্যাংকের নিয়ম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে একজন গ্রাহকের একাধিক কার্ড থাকতে পারে। ফলে কার্ডগুলো অবৈধ সুবিধা বা ঘুষ লেনদেনে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও লেনদেনের তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
ঋণ নবায়নেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
শুধু ক্রেডিট কার্ড নয়, ব্যাংকের ঋণ নবায়ন ও গ্রাহক পরিদর্শনের ক্ষেত্রেও বিএসডি-৯-এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রনজিত কুমার রায়ের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে যাওয়া হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের কেআর স্টিলের প্রায় ১৮ কোটি টাকার ঋণ নবায়নসংক্রান্ত পরিদর্শনেও অনৈতিক সুবিধা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা দাবি এবং তা দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ব্যাংকার।
‘অডিটের নামে চাপ’
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংক পরিদর্শনের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে কিছু কর্মকর্তা চাপ সৃষ্টি করেন বলে তারা মনে করেন। তার ভাষ্য, অনৈতিক সুবিধা না দিলে ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আপত্তি তোলা বা ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
তবে ওই কর্মকর্তার বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তার ভিন্ন ব্যাখ্যা
অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কারও পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতা ভালো থাকলে একাধিক ক্রেডিট কার্ড থাকা নিজে থেকেই অস্বাভাবিক নয়। তবে একই ব্যক্তির নামে অনেকগুলো কার্ড থাকলে সেগুলোর ব্যবহার, পরিশোধের ইতিহাস এবং ঋণসীমার যথাযথতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভ্যন্তরীণভাবে যাচাই করা যেতে পারে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-৯-এর পরিচালক রনজিত কুমার রায়ের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রনজিত কুমার রায় ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-৯-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা, সীমা, ব্যবহার, পরিশোধের উৎস, ব্যাংক পরিদর্শনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর যোগাযোগের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

