ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
ঢাকা

menu

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধ, ইরানের জন্য সুবিধাজনক কেন

আওয়াজ ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৩১, ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধ, ইরানের জন্য সুবিধাজনক কেন

ছবি সংগৃহীত

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি তাৎক্ষণিক বিশ্বাস করা কঠিন মনে হচ্ছিল। এই হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে যায়। ইরানে আবারও হামলা চালানো শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। অস্বাভাবিক ছিল ঘটনাটি।

ধারণা করা হয়, তেহরান যুদ্ধবিরতি দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। যদি যুদ্ধবিরতিতে অগ্রাধিকার দিত; তবে হামলাটি ব্যাখ্যা করা কঠিন। কিন্তু ইরানের নেতারা যদি মনে করেন, একটি নিয়ন্ত্রিত সংঘাত অধিকতর কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে, তবে এই সিদ্ধান্ত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো- তেহরান মনে করে যে, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও একটি সীমিত যুদ্ধ তাদের স্বার্থের জন্য অধিকতর অনুকূল।

বর্তমানে কোনো পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না। ওয়াশিংটন এমন কোনো ব্যাপক আঞ্চলিক সংঘাতের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি; যা এই অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ওয়াশিংটনের এমন কোনো ইচ্ছা নেই যাতে অনেক দেশকে জড়িয়ে পারে, তেলের দাম বেড়ে যায় এবং নিজেদের সামরিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

এরই মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কাজ শুরু করছে। তবে ইরান কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্নই থেকে যাচ্ছে।

তবে সীমিত আকারের সংঘাত ইরানের জন্য এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। যদিও ইরানকে এ জন্য বড় ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে। তবুও হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন এবং হুতিদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দাব এলাকায় সৃষ্ট চাপ বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল, বিমার খরচ ও জ্বালানি বাজারের ওপর প্রভাব ফেলে চলেছে। এমনকি সামান্য অনিশ্চয়তাও বিভিন্ন সরকার, জাহাজমালিক ও আমদানিকারকদের ইরানের দাবির প্রতি মনোযোগ দিতে বাধ্য করতে পারে। তেহরান মনে করে, তাদের হাতে এখনও দরকষাকষির মতো যথেষ্ট হাতিয়ার বা প্রভাব রয়েছে।

ইরান কূটনৈতিক আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। অবাধ নৌ-চলাচলের নীতি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে, তারা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাটি ইরানের সঙ্গে সম্মত বা তাদের দ্বারা পরিচালিত নিয়মকানুনের আওতাধীন হওয়া উচিত। 
যদি এটি ঠিক হয়, তবে তেহরানের লক্ষ্য হতে পারে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ। একটি চলমান ও সীমিত মাত্রার সংঘাত ইরানকে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য চাপ বজায় রাখার সুযোগ করে দেবে।

নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা রেখে যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার চেয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না গিয়ে সংকট জিইয়ে রাখাই তেহরানের কাছে হয়ত ভালো।

এর পেছনে অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশও থাকতে পারে। ইরানকে এখনো অত্যধিক মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং জনঅসন্তোষের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বাহ্যিক সংঘাতের সময় সরকারের পক্ষে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা দমন করা, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার যৌক্তিকতা তুলে ধরা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্নে জনসমর্থন সুসংহত করা অনেকটা সহজ হয়ে ওঠে। এতে ইরানের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না হলেও রাজনৈতিক চাপ হয়তো কিছুটা কমে আসতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে কৌশলটি বাস্তবায়নের জন্য কোনো বড় ধরনের মূল্য দিতে হচ্ছে না। ইরানকে ক্রমাগত সামরিক আঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে বর্তমান ভারসাম্য বজায় রাখা যে সম্ভব হবে; তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তেহরান বর্তমানে এমন বৈপরীত্যের মুখোমুখি। অসম্পূর্ণ শান্তির তুলনায় একটি নিয়ন্ত্রিত সংঘাত হয়তো অধিকতর কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের একপর্যায়ে তা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার প্রবণতা থাকে। ইরানের ধারণা, তারা পরিস্থিতির উত্তেজনা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে যাতে সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক কূটনীতির ওপর চাপ বজায় রাখা যায়।

তবে এই হিসাব-নিকাশের মধ্যে ঝুঁকিও রয়েছে। অনেক বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ শেষ না হলে আন্তর্জাতিক সমর্থন হারাতে পারে তেহরান।


সংঘাতটি যে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে, তার লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। সৌদি আরব—যারা শুরুতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছিল, তারা এখন ইরাকে ইরান-ঘনিষ্ঠ শিয়া গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে যদি বিঘ্ন অব্যাহত থাকে, তবে যেসব দেশ এতদিন পর্যন্ত এ বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে, তারাও হয়তো ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।

অনেকে আবার আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহতকারী সংকটের চেয়ে স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে আগ্রহী হতে পারে।
উপরে উল্লিখিত সম্ভাবনাগুলো—যার মধ্যে আরও দেশের সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত; শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হবে কি না, তা অনিশ্চিত। অনেক কিছুই নির্ভর করছে তেহরানের ওপর। তারা কি এমন কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া উসকে না দিয়েই নিজেদের পদক্ষেপগুলো সুপরিমিত রাখতে পারবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশকে আমূল বদলে দিতে পারে? পরবর্তী কোনো আকস্মিক আঘাতই হয়তো নির্ধারণ করে দেবে যে, এই সংঘাত কোন পথে মোড় নেবে।
 

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!