পুলিশ হেফাজতে তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরের স্বামী ও দলীয় কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিজেপির বিক্ষোভে মুখে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়েছে উঠে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বীজপুরের হালিশহর। এ সময় তাঁর প্রাণহানিও ঘটতে পারতো বলে দাবি করেছেন তিনি।
একসময় বিক্ষোভের মুখে পড়ে কার্যত ফিরে আসতে হয় মমতাকে। এ সময় বিজেপির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, ‘আমার গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়েছে। গাড়ির জানালা বন্ধ না থাকলে আমার মাথা ফেটে যেতে পারত। মাথায় মারাত্মক আঘাত লেগে প্রাণহানিও হতে পারত। আমাদের সবার জীবন বিপন্ন হতে পারত। জীবনে এমন হামলা আমি কখনও দেখিনি। পুলিশের সামনেই আমার ওপর হামলা হয়েছে।’
রোববার দুপুরে কাঁচরাপাড়া পৌরসভার তৃণমূলের পদত্যাগী কাউন্সিলরের স্বামী মৃত বিরজু কেওটের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য দোলা সেন ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের একাধিক নেতানেত্রী। হালিশহরে মমতার গাড়ি বহরকে ঘিরে ধরে ‘চোর’ স্লোগান উঠতে থাকে। এর পাশাপাশি উড়ে আসে ইট, পাথর, জুতো, কাদা। মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। এমনকি বিক্ষোভকারীদের সামলাতে স্থানীয় পুলিশকেও কার্যত হিমশিম খেতে হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে ব্যাপক পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
একে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করে মমতা বলেন, ‘এই ধরনের বর্বরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যা ঘটেছে, তার জন্য আমি স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেই দায়ী মনে করি’।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। যতদূর পর্যন্ত যাওয়া দরকার, আমি এই বিষয়টি নিয়ে ততদূর যাব। আক্রান্ত পরিবারের সদস্যদের আমি আশ্বাস দিচ্ছি, তাদের আইনি লড়াইয়ে যতটা সম্ভব সাহায্য করব।’
এ ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘পুলিশের চোখের সামনে সবকিছু ঘটেছে, অথচ পুলিশ তা থামানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।’
চাঁদাবাজি, হুমকিসহ একাধিক অভিযোগে শুক্রবার স্থানীয় তৃণমূল কর্মী বিরজু কেওটকে গ্রেপ্তার করে হালিশহর থানা পুলিশ। এরপর আদালতের নির্দেশে পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ডের পর লকআপে থাকা অবস্থায় তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুতে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন নিহতের স্ত্রী ও হালিশহর পৌরসভার সাবেক তৃণমূল কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওট।
মৃত বিরজু কেওটের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে গেলেও পরিবারের পক্ষে তৃণমূল নেত্রীকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তারা কোনো রাজনৈতিক সাহায্য চান না। তাদের দাবি, ঘটনার প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তাঁরা শুধু ন্যায়বিচার চান। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন মমতা। মৃতের দাদার সঙ্গেও কথা বলেন তিনি।
তৃণমূল এমপি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এটি যদি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে বিচার হবেই। পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা যাবে না। ঘটনার দায় নিয়ে রাজ্যের ডিজি এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগও দাবি করেন কল্যাণ।
তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, স্থানীয় বিধায়ক পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখিয়ে গেছেন। তাদের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
মমতা বন্দোপাধ্যায় জানান, এই ঘটনার শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে তৃণমূল কংগ্রেস। মৃতের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য তারা সমস্ত স্তরে যাবেন।
স্থানীয় বীজপুর আসনের বিজেপি বিধায়ক সুদীপ্ত দাস বলেছেন, এই ঘটনা নিয়ে মমতা বন্দোপাধ্যায় রাজনীতি করতে এসেছেন। আসলে তিনি সবসময়ই লাশের রাজনীতি করে থাকেন।

