বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এখনো তুলার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭২ দশমিক ৭ শতাংশই তুলাভিত্তিক। অথচ বিশ্ববাজারে তুলাভিত্তিক পোশাকের গড় অংশ ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অ-তুলা ও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) এক বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ তুলার ওপর নির্ভরশীল প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর অন্যতম। তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর চেয়ে বেশি নির্ভরশীল পাকিস্তান, যেখানে তুলাভিত্তিক পোশাকের অংশ ৮৫ দশমিক ১ শতাংশ। ভারতে এ হার ৭৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে অ-তুলা ও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের দিকে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানিতে তুলার অংশ ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ, চীনে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশেও পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ২০১৬ সালে দেশের পোশাক রপ্তানিতে কৃত্রিম তন্তুর অংশ ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ অ-তুলা পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ছে, তবে এ পরিবর্তনের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কৃত্রিম ও কারিগরি তন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ, রং ও পোশাকের শেষ ধাপের প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে এ খাতে দ্রুত সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি অ-তুলা কাপড় ব্যবহারে দক্ষ কারিগরি জনবল তৈরির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব পোশাকের রং ও প্রক্রিয়াজাতকরণে তুলনামূলকভাবে বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হয়। এ কারণে শিল্পকারখানায় নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়া অ-তুলা পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ নীতি সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ এ ধরনের নীতি সহায়তার মাধ্যমে অ-তুলা পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে তুলা এখনো বড় শক্তি এবং অদূর ভবিষ্যতে এ নির্ভরতা পুরোপুরি কমে যাবে না। তবে কৃত্রিম ও অন্যান্য অ-তুলা তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু বেশি পরিমাণে পোশাক রপ্তানির পরিবর্তে উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে পরিবর্তন আসবে, তা মোকাবিলায় পোশাক খাতে পণ্যের বৈচিত্র্য ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষণ বলছে, তুলার পাশাপাশি অ-তুলা পোশাকে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, জ্বালানি সরবরাহ এবং নীতি সহায়তা—এই চার ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির বড় ভিত্তি হতে পারে।

