ঢাকা শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ঢাকা

menu

ঈদে টানা ছুটি দেশের অর্থনীতিতে প্রবল আঘাত

মোঃ দিদার হোসেন (সজীব)

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ১২:১৯ এএম

ঈদে টানা ছুটি দেশের অর্থনীতিতে প্রবল আঘাত

ছবি সংগৃহীত

প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে দেশে উৎসবের আমেজ তৈরি হলেও দীর্ঘ সরকারি ছুটি দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে টানা ৭ থেকে ১০ দিনের ছুটিতে উৎপাদন, রপ্তানি, ব্যাংকিং কার্যক্রম, বন্দর পরিচালনা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। এতে একদিকে যেমন শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতার ঝুঁকিও বাড়ে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাতের বড় অংশই নিয়মিত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে যায়।

ব্যবসায়ীদের মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে রপ্তানিমুখী শিল্প খাত। তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানাগুলো কয়েকদিন বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার এই সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া দেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একজন পোশাক রপ্তানিকারক জানান, “ঈদের ছুটিতে শ্রমিকরা গ্রামের বাড়িতে চলে যান। ছুটি শেষে সবাই সময়মতো কাজে ফিরতে পারেন না। এতে উৎপাদন স্বাভাবিক হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগে। ফলে পুরো উৎপাদন চক্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।”

শুধু শিল্প খাত নয়, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতেও দীর্ঘ ছুটির প্রভাব স্পষ্ট। টানা কয়েকদিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত এলসি নিষ্পত্তি, চেক ক্লিয়ারিং, ব্যবসায়িক লেনদেন ও আর্থিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয়। অনেক ব্যবসায়ী সময়মতো অর্থ ছাড় করতে না পারায় সমস্যায় পড়েন। যদিও বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিং কিছুটা সহায়তা করছে, তবুও বড় অঙ্কের করপোরেট লেনদেনে এখনো ব্যাংকনির্ভরতা রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ ছুটির কারণে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজও স্থবির হয়ে পড়ে। নির্মাণকাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়। এর ফলে ব্যয় বাড়ে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি কমে যায়। বিশেষ করে অর্থবছরের শেষ দিকে দীর্ঘ ছুটি থাকলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি হয়।

এদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোয় কার্যক্রম সীমিত থাকায় আমদানি-রপ্তানি পণ্যের জট তৈরি হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাস ধীর হয়ে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত গুদাম ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়। একই সঙ্গে বাজারে কিছু পণ্যের সরবরাহেও সাময়িক সংকট দেখা দিতে পারে।

তবে অর্থনীতির আরেকটি অংশ বলছে, ঈদের ছুটি দেশের ভোগব্যয় বাড়ায় এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক প্রভাবও ফেলে। ঈদকে কেন্দ্র করে কেনাকাটা, পরিবহন, পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও অনলাইন বাণিজ্যে ব্যাপক লেনদেন হয়। গ্রামে অর্থ প্রবাহ বাড়ে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাড়তি আয় করেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অস্থায়ী ভোগব্যয়ের সুফল দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ক্ষতির তুলনায় অনেক কম।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক বলেন, “ঈদ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ালেও দীর্ঘ ছুটিতে উৎপাদন ও সেবা খাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়, তা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো নয়। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সাধারণত উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখার চেষ্টা করে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ ছুটির সময় গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলো আংশিক চালু রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বন্দর, ব্যাংক, কাস্টমস ও রপ্তানিমুখী শিল্পে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম অব্যাহত রাখা গেলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা আরও সম্প্রসারণ করলে অনেক প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম ছুটির মধ্যেও চালু রাখা যেতে পারে।

শ্রমবাজারেও দীর্ঘ ছুটির প্রভাব রয়েছে। ঈদের আগে ও পরে অনেক কর্মী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। বিশেষ করে পরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কারণে শ্রমিকদের সময়মতো ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে বিলম্ব হয়।

এছাড়া দীর্ঘ ছুটিতে নগর অর্থনীতিও ধীর হয়ে পড়ে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়। ফলে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষ আর্থিক সংকটে পড়েন। রিকশাচালক, ক্ষুদ্র দোকানি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা এই সময়ে তুলনামূলক কম আয় করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ভবিষ্যতে ছুটির পরিকল্পনায় ভারসাম্য আনা জরুরি। একদিকে মানুষের উৎসব উদযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে ছুটি, রোটেশন পদ্ধতিতে অফিস চালু রাখা বা বিশেষ অর্থনৈতিক সেবা সচল রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

সব মিলিয়ে ঈদের দীর্ঘ ছুটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগে কয়েকদিনের স্থবিরতাও দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, “এমনিতেই আমাদের অর্থনীতি চাপের মুখে। এ অবস্থায় ঈদ-উল-ফিতরে নয়দিন আর ঈদ-উল-আজহায় ৭ দিন। দেশের অর্থনীতির সবকটি খাত বন্ধ হয়ে আছে। এটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু না। যেখানে একদিন বন্ধ দিয়ে পরদিন কারখানা চালু রাখা উচিত, সেখানে  ৭দিন ধরে সব বন্ধ রেখে বসে থাকার কোনো যৌক্তিকতাই নেই।”

তাসকিন বলেন, “এমন না মানুষ ৭ দিন ছুটি কাটিয়ে পূর্ণোদ্যমে কাজে যোগদান করবে। ঈদের আমেজ কাটতে কাটতে যাবে আরও এক সপ্তাহ। যদি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মাসের এতো গুলোদিন বন্ধ থাকে সেটির বিরূপ প্রভাব যেমন মালিকদের ওপর পড়বে, একইভাবে ভোগাবে শ্রমিকদেরও।”

ছুটি প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম বলেন, “টানা ছুটি দেওয়া একটি বড় সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মনে হয় না সরকার অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এছাড়া স্বাভাবিকভাবেই দেশের অর্থনীতিতে এত লম্বা ছুটির আংশিক প্রভাব এড়ানোর সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছুটিতে থাকলেও কারখানা ছুটির বেলায় কারখানা আইন মেনে ছুটির দেওয়ার পরামর্শ দেন এ গবেষক।

দীর্ঘ ছুটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে উল্লেখ করে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ হেলাল উদ্দিন বলেন, “লম্বা ছুটিতে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক উইং সচল রাখা খুব জরুরি ছিল। যেমন, আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের সবকটি ব্যাংক বন্ধ। যেসব ব্যাংক বা ব্যাংকের উইং আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত তাদের ৭ দিন বন্ধ দিলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চাইলে এই লম্বা ছুটিতে বিশেষায়িত বেশ কয়েকটি ব্যাংক খোলা রাখা যেত।”

এই দীর্ঘ ছুটিতে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সুবিধা হলেও কীভাবে সীমিত মানুষ দিয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা যায়—তার কোনো নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ছিল না। আগামীতে পরিকল্পনামাফিক ছুটি দিয়ে ক্ষতি এড়ানোর আহ্বান জানান এ অর্থনীতিবিদ।

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!