পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডকে ঘিরে চলমান তদন্তের মধ্যেই কোম্পানিটির স্পন্সর পরিচালক রুবিনা হামিদ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, রুবিনা হামিদের হাতে থাকা মোট ৭১ লাখ ১ হাজার ৫৮৯টি শেয়ারের মধ্যে তিনি ১০ লাখ শেয়ার বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী ৩০ এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে এই শেয়ার বিক্রি সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন সময় এই সিদ্ধান্ত এসেছে যখন কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, আইপিও তহবিলের অপব্যবহার এবং শেয়ার কারসাজির অভিযোগ তদন্ত করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
### শুরু থেকেই বিতর্কে কোম্পানি
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি বিডি থাই ফুড ২০২২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকেই নানা বিতর্কে জড়ায়। বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের পরিবারের মালিকানাধীন হওয়ায় কোম্পানিটি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা পেয়েছে। রুবিনা হামিদ তার বোন।
আইপিওর অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ
কোম্পানিটি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বাজার থেকে ১৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এই অর্থ ব্যবসা সম্প্রসারণ, ভবন নির্মাণ ও নতুন যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ব্যয় হওয়ার কথা ছিল।
তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কোম্পানিটি আইপিও তহবিলের মাত্র ৬১ শতাংশ ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে তারা সময়সীমা আরও ছয় মাস বাড়ানোর আবেদনও করেছে।
বিএসইসির তদন্তে উঠে এসেছে, তহবিলের একটি বড় অংশ যথাযথ খাতে ব্যবহার না করে অলস রাখা হয়েছে অথবা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে।
উৎপাদন বন্ধ, লোকসান বাড়ছে
৩০ জুন ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৩ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। বর্তমানে তাদের কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
একটি ব্রোকারেজ হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোম্পানির উদ্যোক্তারা নিয়মিত নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। তার অভিযোগ, আইপিওর অর্থও যথাযথভাবে ব্যবহার হয়নি।
অস্বাভাবিক শেয়ার দর বৃদ্ধি
কোম্পানির আর্থিক অবস্থার অবনতি হলেও গত পাঁচ মাসে শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৬ নভেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১০ টাকা ৫০ পয়সা, যা সর্বশেষ কার্যদিবস ২৮ এপ্রিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ টাকা ৭০ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসে শেয়ারটির দর বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।
বিনিয়োগকারী মাহমুদুল হাসান রানা বলেন, কোম্পানির কারখানা বন্ধ, ঋণ বেশি এবং আয় কম—এমন অবস্থার পরও শেয়ারের দর বাড়া স্বাভাবিক নয়। এর পেছনে কারসাজির আশঙ্কা রয়েছে।
ঋণের চাপ ও দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি
কোম্পানিটির মোট ঋণ ও দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৯ কোটি টাকা, যেখানে পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক দেখানো হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগও নেই।
নিরীক্ষকরা তাদের প্রতিবেদনে কোম্পানিটিকে ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো সময় বড় আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।
রহস্যজনক ডাকাতির ঘটনাও প্রশ্নে
ধামরাইয়ে অবস্থিত কোম্পানির কারখানায় গত এক বছরে তিনবার ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
সবশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুখোশধারীরা প্রায় দেড় কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যায় বলে দাবি করা হয়। এত বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে বারবার এমন ঘটনা ঘটায় বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কী বলছে বিএসইসি
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, কোম্পানির সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম হেলাল আহম্মেদ খান বলেন, তদন্তাধীন অবস্থায় উদ্যোক্তা পরিচালকের শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয় এবং বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে কোম্পানির পক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

