বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—যা অনেকের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিত—একটি স্মরণীয় দিন। দীর্ঘ আন্দোলন, সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির পর সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। ক্ষমতার এই নাটকীয় পরিবর্তনের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নেমে আসে মানুষের ঢল। বহু মানুষের কাছে দিনটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসানের প্রতীক।
সেদিন ভোরে রাজধানী ছিল কঠোর কারফিউর আওতায়। আগের কয়েক দিনের সংঘর্ষের রক্তাক্ত চিহ্ন তখনও ছড়িয়ে ছিল বিভিন্ন সড়কে। চারদিকে থমথমে পরিবেশের মধ্যেই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর। প্রথমে অনেকেই বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খবরটি নিশ্চিত হতে শুরু করলে পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যায়।
এর মধ্যেই পূর্বঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে সেই জনস্রোতের দৃশ্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লে আরও অনেকে আন্দোলনে যোগ দেন। রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।
সেদিনও রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ী, চানখারপুল, শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা, মোহাম্মদপুর ও আমিনবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গুলির ঘটনাও ঘটে। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রাণের ঝুঁকি উপেক্ষা করেও বহু মানুষ রাজপথ ছাড়েননি এবং কয়েকজন প্রাণ হারান।
দিনভর নানা গুঞ্জনের পর দুপুরে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার কথা জানান। এরপর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানও শিথিল হতে শুরু করে।
দুপুরের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর রাজপথে নেমে আসে মানুষের ঢল। অনেককে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠতে দেখা যায়, কেউ কেউ সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকাতেও বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার অবসান ঘটেছে—এমন অনুভূতিতে দিনটি উদযাপন করেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে। পরবর্তী সময়ে তা সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। কয়েক সপ্তাহের টানা বিক্ষোভ, সহিংসতা এবং প্রাণহানির পর ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।
‘৩৬ জুলাই’ এখন অনেকের কাছে গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন থাকলেও, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা এবং নিহতদের স্বজনদের প্রত্যাশা, সেই সময়ের ঘটনাগুলো ইতিহাসে যথাযথভাবে সংরক্ষিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার শিক্ষা গ্রহণ করবে।

