ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
ঢাকা

menu

পার্কের বেঞ্চ থেকে কেএল টাওয়ার—মালয়েশিয়ায় জাওয়াদের নয় বছরের পথচলা

আওয়াজ ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম

পার্কের বেঞ্চ থেকে কেএল টাওয়ার—মালয়েশিয়ায় জাওয়াদের নয় বছরের পথচলা

ছবি সংগৃহীত

পাবনার এক তরুণের স্বপ্নের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ আর অনিশ্চয়তায় ভরা সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অনিশ্চয়তাই পরিণত হয়েছে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে। প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা, শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে জাওয়াদ করিমের মালয়েশিয়ায় কাটানো প্রায় নয় বছরের গল্প আজ এক ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

অচেনা শহরে কঠিন প্রথম রাত

মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই প্রথম ধাক্কা খেতে হয় তাঁকে। যে দালাল থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল, বাস্তবে সেখানে কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কয়েক দিন হোটেলে কাটানোর পর অর্থসংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে এক রাত তাঁকে পার্কের বেঞ্চেই কাটাতে হয়।

নতুন দেশে সেই রাত ছিল অনিশ্চয়তা, ভয় আর বাস্তবতার প্রথম বড় শিক্ষা। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে থাকার জায়গা, পড়াশোনা এবং কাজ—সবকিছুই গুছিয়ে নিতে সক্ষম হন তিনি।

পড়াশোনার পাশাপাশি সংগ্রাম

বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে মালয়েশিয়ায় টিকে থাকা সহজ ছিল না। তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা ও পরে স্নাতক সম্পন্ন করার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য অল্প বয়স থেকেই কাজ শুরু করেন জাওয়াদ।

অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার নির্মাণ, প্রোগ্রামিং, ভিডিও সম্পাদনা, গ্রাফিক ডিজাইন, সংগীত এবং ডিজিটাল মার্কেটিং—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ডিজিটাল বিপণনের ওপর আন্তর্জাতিক দুটি প্রতিষ্ঠানের পেশাগত সনদও অর্জন করেন।

বিদেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করতে তাঁকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেক সময় নিজের চেয়ে বয়সে বড় সহকর্মীদের সঙ্গেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

বন্ধুদের ভিডিও থেকে নিজের যাত্রা

প্রথমদিকে বন্ধুদের ইউটিউব ভিডিও সম্পাদনা, কভার ডিজাইন ও বিভিন্ন গ্রাফিক তৈরিতে সহায়তা করতেন জাওয়াদ। ধীরে ধীরে বন্ধুদের ভিডিওতেই উপস্থিত হতে শুরু করেন। পরে নিজের ইউটিউব চ্যানেল চালু করলে মাত্র এক মাসেই সেখানে ২৫ হাজারের বেশি অনুসারী যুক্ত হয়।

যদিও পরে তিনি নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ থেকে সরে আসেন, তবুও মালয়েশিয়ার কয়েকজন পরিচিত কনটেন্ট নির্মাতার ভিডিওতে তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে সংগীত, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং বিভিন্ন সৃজনশীল প্রকল্পেও যুক্ত ছিলেন। মালয়েশিয়ায় নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রেও অভিনয় করেন।

কেএল টাওয়ারের পর্দায় নিজের কাজ

দীর্ঘদিন ভিডিও ও গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে কাজ করার ফলস্বরূপ একসময় তাঁর তৈরি একটি গ্রাফিক ভিডিও কুয়ালালামপুরের বিখ্যাত কেএল টাওয়ারের ডিজিটাল পর্দায় প্রদর্শিত হয়।

নিজের তৈরি কাজ শহরের অন্যতম পরিচিত স্থাপনায় প্রদর্শিত হতে দেখা তাঁর জন্য ছিল স্মরণীয় এক মুহূর্ত, যা দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি দেখেন।

বড় আয়োজনের নেপথ্যে

মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে তিনি ডাটুক নিতেশ মালানির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। এ সময় গভর্নর, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত একাধিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন।

এসব কাজের মাধ্যমে অতিথি সমন্বয়, গণমাধ্যম পরিচালনা, যোগাযোগ এবং বড় পরিসরের অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

কৌতূহল থেকে আর্থিক বাজারে আগ্রহ

কৈশোরেই আর্থিক বাজারের প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয় জাওয়াদের। প্রায় ১৬ বছর বয়সে নিজের সঞ্চয়ের অর্থ নিয়ে অনলাইন ট্রেডিং শুরু করেন। শুরুতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়লেও পরে অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই ক্ষতি পুষিয়ে মূল অর্থের প্রায় দ্বিগুণ করতে সক্ষম হন।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল বাজার নয়, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিও আরও আগ্রহী করে তোলে।

গবেষণা থেকে নতুন স্বপ্ন

স্নাতক পর্যায়ের শেষ গবেষণায় তিনি আর্থিক বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার নিয়ে কাজ করেন। তাঁর একাডেমিক সাফল্য ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ডিপ্লোমা ও স্নাতক পর্যায়ের দুইজন ডিন পৃথকভাবে সুপারিশপত্র প্রদান করেন।

বাংলাদেশের একটি রোটারি ক্লাবও স্বেচ্ছাসেবী ডিজিটাল পরামর্শক হিসেবে তাঁর অবদানের জন্য সুপারিশপত্র দেয়।

সম্প্রতি আর্থিক প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৩০টি শর্তসাপেক্ষ ও শর্তহীন স্নাতকোত্তর ভর্তির প্রস্তাব পেয়েছেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই যুক্তরাজ্যের।

সামনে কোন পথ?

নয় বছরের মালয়েশিয়া অধ্যায়ে সংগ্রাম যেমন ছিল, তেমনি ছিল শেখার সুযোগ, সৃজনশীল কাজ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা।

এখন তাঁর সামনে দুটি সম্ভাবনার পথ—উচ্চশিক্ষা নাকি আন্তর্জাতিক পেশাজীবন। কোন পথ তিনি বেছে নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—পার্কের বেঞ্চে কাটানো সেই অনিশ্চিত রাত থেকে কেএল টাওয়ারের ডিজিটাল পর্দায় নিজের কাজ তুলে ধরার যাত্রা দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে ধৈর্য, শেখার আগ্রহ এবং লেগে থাকার মানসিকতা।

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!