বাংলাদেশের আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট হতে যাচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—এই তিন বাস্তবতার সমন্বয়ে তৈরি একটি কঠিন বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার আলোচনায় ইতোমধ্যে বাজেটের সম্ভাব্য রূপরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বাজেটের আকার ৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। বিভিন্ন সূত্রে মোট ব্যয়ের সম্ভাব্য আকার ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হওয়ার আভাস মিলেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হবে—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, অন্যদিকে রাজস্ব বাড়িয়ে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সচল রাখা।
রাজস্ব আদায়ে বড় চাপ
আসন্ন বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রেকর্ড পরিমাণ বাড়তে পারে। বিভিন্ন প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআরের জন্য প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার কথা উঠে এসেছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে। ১০ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতির তথ্য সামনে এসেছে।
এ অবস্থায় সরকার করের আওতা বাড়াতে ডিজিটাল নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় এবং ব্যাংকিং লেনদেনভিত্তিক কর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে। এনবিআরের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ট্রেড লাইসেন্স ও ইউটিলিটি তথ্য সংযুক্ত করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
আইএমএফের শর্তে কমতে পারে কর অব্যাহতি
আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে কর অব্যাহতি ও ভর্তুকি কমানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। আসন্ন বাজেটে নতুন করে কর ছাড় কমানো, ভ্যাট অব্যাহতি সীমিত করা এবং আমদানি পর্যায়ে কিছু সম্পূরক শুল্ক কমানোর উদ্যোগ আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপের ফলে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে সরকার যুক্তি দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় লক্ষ্য
আসন্ন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন আলোচনায় আগামী বাজেটে “জনস্বস্তির বাজেট” তৈরির দাবি উঠেছে।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। যদিও বর্তমানে মূল্যস্ফীতি এখনও তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বড় এডিপি, বাড়বে উন্নয়ন ব্যয়
আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। এতে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন, কৃষি ও কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পে জোর দেওয়া হতে পারে।
বিশেষ করে বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা পুনরায় চালু এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ৬০০ বিলিয়ন টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাজেট নীতির সঙ্গেও সমন্বয় হতে পারে।
কোন খাতগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রাক-বাজেট আলোচনায় যেসব খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো হলো—
* কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
* রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত
* স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা
* ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)
* ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা
* কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতি
এছাড়া ব্যাংক খাতে সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদারের বিষয়ও বাজেট বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য কী থাকতে পারে
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমানো। এজন্য নিত্যপণ্যে কিছু শুল্ক ছাড়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বৃদ্ধি এবং কৃষি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ আসতে পারে। তবে একই সঙ্গে কর আদায় বাড়ানোর কারণে নতুন কিছু সেবা ও খাতে করের চাপও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় বড় বাজেট কাগজে থাকলেও বাস্তবে উন্নয়ন ব্যয় কমে যেতে পারে এবং ব্যাংকঋণনির্ভর ঘাটতি অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
তাদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হবে মূলত “সংকট মোকাবিলা ও সংস্কারনির্ভর বাজেট”—যেখানে জনস্বস্তি, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

