ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
ঢাকা

menu

ভেনেজুয়েলায় প্রাণহানি ১৭০০ ছাড়িয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ১০:৫২ এএম

ভেনেজুয়েলায় প্রাণহানি ১৭০০ ছাড়িয়ে

ছবি সংগৃহীত

গত সপ্তাহে আঘাত হানা শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার অনেক এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি। ফলে স্বজন ও প্রতিবেশীদের উদ্ধারে স্থানীয় বাসিন্দাদেরই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি বন্দরনগরী লা গুইরায় বিবিসির প্রতিবেদক দেখেছেন, মানুষ ক্রোবার, হাতুড়ি ও গাঁইতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে স্বজনদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। দেশজুড়ে এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সোমবার (২৯ জুন) ভোরে একটি আফটারশক (পরাঘাত) আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। তবে এতে নতুন করে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিনি এ ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের "সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে সোমবার ভোরে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার পর ২১ বছর বয়সী এক যুবককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

গত বুধবার মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প উত্তরাঞ্চলীয় লা গুইরা অঙ্গরাজ্যে আঘাত হানে। এতে প্রায় ৮০০ ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে।

সোমবারের আফটারশকটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬, যা লা গুইরা ও রাজধানী কারাকাসেও অনুভূত হয়। লা গুইরার পাশের শহর ক্যাটিয়া লা মারেও উদ্ধারকাজের বড় অংশ পরিচালনা করছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল। তবে সরকারি তৎপরতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন

বিবিসি জানায়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও ধ্বংসস্তূপে তাদের তেমন সক্রিয়ভাবে উদ্ধারকাজে অংশ নিতে দেখা যায়নি।

৩২ বছর বয়সী ইলেকট্রিশিয়ান রুবেন রোহাস বলেন, "সিভিল প্রোটেকশনের সদস্যরা সাহায্য করতে এসেছেন, কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। সরকার সেগুলো সরবরাহ করেনি। তারাও আমাদের মতো খালি হাতেই কাজ করছেন।"

লা গুইরা শহরে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহারও ছিল খুবই সীমিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ভবনে কয়েক দিন ধরে মানুষ হাতে উদ্ধারকাজ চালালেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছেছে অনেক দেরিতে। ৩৯ বছর বয়সী ক্যারোলিন জেরপা নিজের বাবা ও ভাইকে ধ্বংসস্তূপের নিচে খুঁজছেন। বিবিসি মুন্দোকে তিনি বলেন, "শুধু একটি গাঁইতি দিয়ে আসলে তেমন কিছুই করা যায় না।"

তিনি জানান, এখন আর জীবিত উদ্ধারের আশা করছেন না। পরিবারের সদস্যদের মরদেহ উদ্ধার করে যথাযথভাবে দাফন করাই তার একমাত্র লক্ষ্য।

১৫ বছর ধরে লা গুইরায় বসবাসকারী জুলি মারিন বলেন, এমন ভয়াবহ দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হলেও সরকারি সাড়া অত্যন্ত ধীর ছিল। দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেন, "আমি আমার ভাতিজি ও ভগ্নিপতিকে হারিয়েছি। উদ্ধারকারী দল ও যন্ত্রপাতি যদি আরও আগে আসত, তাহলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো।"

কারাকাসের পশ্চিমে পাহাড়ি এলাকা এল জুনকিতোতেও সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি খুব কম দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সেখানে কৃষক ও বাসিন্দারাই ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা কেইলি ইবারা বলেন, "আমরা অপেক্ষা করছি ধ্বংসস্তূপ অপসারণ, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রকৃত সহায়তার জন্য।"

সোমবার প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, ২৫ হাজারের বেশি জরুরি সেবাকর্মী, পুলিশ ও সেনাসদস্য ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় কাজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, "প্রতিটি জীবন রক্ষা আশার একটি জয়।" তিনি আরও জানান, ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনের নেতৃত্ব দেবেন তার ভাই এবং জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোকে নিরাপত্তার ভিত্তিতে ট্রাফিক সিগন্যালের মতো রঙভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। যারা বাড়িতে ফিরতে পারবেন না, তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।

সোমবার লা গুইরার কারাবায়েদা শহর থেকে ২১ বছর বয়সী অ্যারন লেভি কান্তিয়ো ভার্গাসকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভেনেজুয়েলা, মেক্সিকো ও এল সালভাদরের যৌথ উদ্ধারকারী দল এ অভিযান পরিচালনা করে।

এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে জানান, উদ্ধার হওয়া যুবককে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আরও জীবিত মানুষকে উদ্ধারের আশা নিয়ে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জাতিসংঘের আবাসিক মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা দেল তিনদারো জানান, বুধবারের ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত ৫০০টির বেশি আফটারশক হয়েছে। তিনি বলেন, অন্তত আড়াই হাজার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার অধিকাংশই সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।

উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ ১০ হাজার মরদেহ সংরক্ষণের ব্যাগ সংগ্রহ করছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে।

ভেনেজুয়েলার জন্য অতিরিক্ত ৩০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে দেশটি ১৫ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নতুন এই সহায়তার অর্থ জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও ত্রাণ সরবরাহে ব্যয় করা হবে।

এদিকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ফোর্ট লডারডেল বর্তমানে লা গুইরার উপকূলে অবস্থান করছে। জাহাজটির নাবিক ও মেরিন সদস্যরা অবতরণযান ব্যবহার করে দুর্গত উপকূলীয় এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস জরুরি ত্রাণসামগ্রীবাহী একটি জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। চীনও প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আওয়াজ নিউজ

banner
Link copied!