বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা গ্রাহকের বকেয়া দাবি (ক্লেইম) পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। একই সঙ্গে দুর্বল বিমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে পর্যায়ক্রমে দাবি নিষ্পত্তি, কমিশন বাণিজ্য বন্ধ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু, ইউনিক পলিসি আইডি বাস্তবায়ন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান।

মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বিমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো গ্রাহকের আস্থা হারিয়ে যাওয়া। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রথম কাজ হবে দ্রুত বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু করা। দাবি পরিশোধ শুরু হলে গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসবে এবং পুরো খাতকে স্থিতিশীল করা সহজ হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাতটি বিমা কোম্পানির মালিক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে আইডিআরএ। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, বিনিয়োগ ও আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোথাও সম্পদের মূল্যায়ন নিয়ে সন্দেহ থাকলে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য, এসব কোম্পানির জমি, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিনিয়োগসহ অন্যান্য সম্পদ ধাপে ধাপে বিক্রি করে অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। প্রতিটি কোম্পানির জন্য আলাদা হিসাব থাকবে এবং তা নিরীক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। পরে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট (এফআইএফও)’ পদ্ধতিতে আগে জমা পড়া দাবিগুলো আগে পরিশোধ করা হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বিমা মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি আটকে আছে। তাই প্রাথমিকভাবে এসব কোম্পানিকেই অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।
সম্পদ নগদায়নের ক্ষেত্রে চারটি উৎস বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভালো ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিক্রিযোগ্য জমি এবং অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বিমা খাতে অতিরিক্ত কমিশন দেওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বেতনের আড়ালে বা বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে কমিশন দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের গোপন কমিশনের প্রমাণ সংগ্রহ এবং নিয়ন্ত্রণে কীভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রচলিত কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যে আর্থিক প্রতিবেদন আসে, সেগুলো অনেক পুরোনো হওয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়। নতুন ব্যবস্থায় নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানির ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। এতে অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
গ্রাহক সুরক্ষায় ইউনিক পলিসি হোল্ডার আইডি চালুর বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে আইডিআরএ। চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিটি বৈধ বিমা পলিসির বিপরীতে গ্রাহকের মোবাইলে একটি ইউনিক আইডি পাঠানো হবে। ভবিষ্যতে কোনো গ্রাহক এই আইডি না পেলে সংশ্লিষ্ট পলিসিতে প্রিমিয়াম না দেওয়ার বিষয়ে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে।
বিমা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সনদ যাচাই আরও কঠোর করা হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয় এবং সিআইবির মাধ্যমে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা হবে।
দুর্বল কোম্পানির পরিচালকদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে জরিমানা আদায়ের সুযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যমান আইনে সে সুযোগ নেই। তবে বিষয়টি নীতিগত আলোচনায় রয়েছে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাতটিতে বহুস্তরীয় সমস্যা রয়েছে। তাই প্রথম ধাপে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ ও খাতকে স্থিতিশীল করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এরপর যেসব ক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থাটিতে জনবল সংকট রয়েছে। সরকারি নিয়োগে সীমাবদ্ধতা থাকায় বিকল্প উপায়ে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও তদারকি জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিমা খাতকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার, অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি এবং গণমাধ্যম—সব পক্ষের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রথম লক্ষ্য গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, এরপর ধাপে ধাপে পুরো খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা।

