দেশের বীমা খাতকে দীর্ঘদিনের সংকট থেকে টেকসইভাবে বের করে আনতে তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেছেন, গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, বীমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম উৎস হিসেবে গড়ে তোলা এবং খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই এগিয়ে নেওয়া হবে সংস্কার কার্যক্রম।
একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রয়োজন হলে বীমা খাতের জন্য এককালীন (ওয়ান-টাইম) বেইলআউট প্যাকেজও বিবেচনা করা হতে পারে। তবে তার আগে বীমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা—উভয় পক্ষকেই সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর সংস্কারের বাস্তব প্রমাণ দিতে হবে।
শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীতে বীমা খাতের অংশীজনদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সপ্তাহেই তিনি খাতের সার্বিক সমস্যা সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। তবে সমস্যার তালিকা তৈরির চেয়ে সমাধানভিত্তিক সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় সংকট আস্থাহীনতা
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে দেশের বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকট গ্রাহকের আস্থার ঘাটতি। বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ বীমা দাবি (ক্লেইম) অনিষ্পন্ন থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা নিয়ে অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বীমা দাবি এখনও পরিশোধ হয়নি। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দাবিগুলো আটকে রয়েছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে পৃথকভাবে বসে সমস্যার ধরন অনুযায়ী সমাধান বের করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রির অর্থ বিভিন্ন কারণে আটকে আছে, তা ছাড়িয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি যেসব কোম্পানির অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে রয়েছে, সেগুলো উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।
বেইলআউটের আগে প্রয়োজন সুশাসনের নিশ্চয়তা
বীমা খাতে এককালীন সরকারি সহায়তার সম্ভাবনা তুলে ধরে চেয়ারম্যান বলেন, প্রয়োজনে ওয়ান-টাইম বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে সরকারের কাছে যাওয়ার আগে খাতকে নিজের ভেতরের দুর্বলতা দূর করার সক্ষমতা দেখাতে হবে।
তার ভাষায়, সরকার স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবে—আজ সহায়তা দিলে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি যাতে আর সৃষ্টি না হয়, তার নিশ্চয়তা কী? এজন্য বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলায় কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
একই সঙ্গে আইডিআরএকেও ব্যাখ্যা করতে হবে অতীতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে সেই দুর্বলতা দূর করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার স্বীকারোক্তি
আইডিআরএ চেয়ারম্যান স্বীকার করেন, অতীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকিতেও দুর্বলতা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে কেবল কমপ্লায়েন্সভিত্তিক সুপারভিশনের ওপর নির্ভর করায় অনেক ঝুঁকি সময়মতো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, এখন থেকে রিস্ক-বেজড সুপারভিশন চালু করা হবে। এ লক্ষ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যভিত্তিক রিয়েল-টাইম নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, "এক বছর আগের তথ্য দিয়ে বর্তমান ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। আমাদের রিয়েল-টাইম তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।"
বীমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের চালিকাশক্তি করার পরিকল্পনা
সংস্কারের দ্বিতীয় স্তম্ভ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সেই তুলনায় বীমা খাতের অবদান এখনও খুবই সীমিত।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বীমা শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান উৎস। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব রয়েছে। ফলে অনেক ভালো কোম্পানিও শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হয় না।
তার মতে, শক্তিশালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে গড়ে উঠতে পারলে পুঁজিবাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমার গুরুত্ব
চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতিবছর দুর্যোগের কারণে জাতীয় অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয় এবং সরকারের বিপুল অর্থ পুনর্বাসন কার্যক্রমে ব্যয় করতে হয়।
তিনি মনে করেন, শক্তিশালী ও বিস্তৃত বীমা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এই আর্থিক চাপের বড় অংশ বেসরকারি বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স ও তাকাফুলে নতুন উদ্যোগ
তিনি বলেন, দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সফল হলেও সেই বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এখনও কার্যকরভাবে মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স বিস্তার করা যায়নি।
এ লক্ষ্যে মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হবে। পাশাপাশি ইসলামি বীমা বা তাকাফুল খাতের জন্যও নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে বলে জানান তিনি।
দক্ষ জনবল তৈরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন
সংস্কারের তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে তিনি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ চালু, বীমা বিষয়ে মেজর ও মাইনর প্রোগ্রাম এবং সার্টিফিকেশন কোর্স চালুর আহ্বান জানান। পাশাপাশি অ্যাকচুয়ারি, আন্ডাররাইটিংসহ বিশেষায়িত বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
`তিন পক্ষের সদিচ্ছা ছাড়া সফল সংস্কার সম্ভব নয়`
বক্তব্যের শেষাংশে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, কোনো খাতের টেকসই সংস্কার সফল করতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং শিল্প উদ্যোক্তা—এই তিন পক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
তিনি বলেন, শুধু সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা নিয়ন্ত্রকের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বীমা কোম্পানিগুলোকেও স্বচ্ছতা, সুশাসন ও দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নিজেদের পরিবর্তনের প্রমাণ দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, "আইডিআরএর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হবে। যেখানে যেতে হবে, যার সঙ্গে কথা বলতে হবে, আমরা করব। কিছু ক্ষেত্রে সফল হব, কিছু ক্ষেত্রে নাও হতে পারি; কিন্তু দেশের বীমা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।"

